রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ যখন রাজনীতির রঙে রঙিন

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ যখন রাজনীতির রঙে রঙিন
Advertisement
Advertisement

সেদিনের ছবিগুলো একই সঙ্গে ছিল চমকপ্রদ এবং উদ্বেগজনক। সেখানে দেখা যাচ্ছিল একদল সাংবাদিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একজন প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্য রাস্তায় নেমে রাজনৈতিক মিছিলে অংশ নিচ্ছেন। যাদের মধ্যে বর্ষীয়ান এবং সাংবাদিক সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ নেতারাও ছিলেন।

যে প্রার্থীর পক্ষের মিছিলে সাংবাদিকরা অংশ নিয়েছিলেন তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন। তার অবস্থান রাজনৈতিকভাবে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এটিই মূল সমস্যা নয়। আমার গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সাংবাদিকরা ছদ্মবেশে থাকা কোনো রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না; তারা নিজেরাই সাংবাদিক ছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের এই দলীয় ভূমিকার কথা গর্বের সঙ্গে প্রচার করছিলেন!

দেশের অনেক সাধারণ মানুষের কাছেই এই দৃশ্যটি বেশ পীড়াদায়ক ছিল। কারণ সাংবাদিকতার চিরন্তন বৈশিষ্ট্যই হলো একে রাজনৈতিক প্রচার বা দলীয় সম্পৃক্ততা থেকে আলাদা থাকতে হয়।

যাদের দায়িত্ব ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, তারা যখন সেই ক্ষমতার পক্ষের মিছিলে অংশ নেন, তখন এই পেশার নৈতিক ভিত্তি ক্ষুণ্ণ হতে শুরু করে।

একসময় যা ছিল নীরব রাজনৈতিক সহানুভূতি, এখন তা প্রকাশ্য প্রচারে রূপ নিয়েছে। আর এর মাধ্যমে সেই রেখাটিকে মুছে যাচ্ছে যা গণতন্ত্রে দৃশ্যমান থাকা জরুরি।

বাংলাদেশে দলীয় সাংবাদিকতা কোনো নতুন বিষয় নয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনৈতিক শক্তি বারবার সংবাদমাধ্যমকে বশ করতে চেয়েছে, আর সংবাদমাধ্যমের একাংশও স্বেচ্ছায় সেই আলিঙ্গনে ধরা দিয়েছে।

সাংবাদিকরা পদ-পদবি, সুযোগ-সুবিধা আর ক্ষমতার নৈকট্যের পুরস্কার পেয়েছেন; বিপরীতে রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাদের পক্ষে সংবাদ প্রচার এবং অপ্রিয় সত্য গোপন করার সুবিধা ভোগ করেছে।

এই পারস্পরিক লেনদেনের সম্পর্ক সাংবাদিকতার ‘অতন্দ্র প্রহরী’র ভূমিকাকে ক্রমান্বয়ে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলেছে। যেখানে চুলচেরা বিশ্লেষণের জায়গা নিয়েছে সুযোগ-সুবিধা লাভের মোহ এবং জবাবদিহিতার জায়গা নিয়েছে আনুগত্য।

তবে সেসবের সঙ্গে বর্তমান সময়ের পার্থক্য দলীয় আনুগত্যের অস্তিত্ব নিয়ে নয়, বরং এর বেপরোয়া ভাব নিয়ে। কর্মরত সাংবাদিকদের প্রকাশ্য প্রচার পেশাদারত্বের অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে।

এটি গণমাধ্যমের নতুন সংস্কৃতিরও প্রতিফলন যেখানে রাজনৈতিক আনুগত্যকে নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে নয়, বরং কর্মজীবনের জন্য লাভজনক কৌশল হিসেবে দেখা হয়।

এমন পরিবেশে সাংবাদিকতা আর মানুষের জন্য কাজ করার পেশা থাকে না, বরং এটি দলীয় যন্ত্রের অংশ হয়ে পড়ে। যেখানে সাংবাদিকতার মোড়কে আসলে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী কাজ করা হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাংবাদিকতা তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে বলে সাময়িক আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন যে, গণমাধ্যমকে ভয় দেখানো বা কুক্ষিগত করার দীর্ঘ সময়ের অবসান ঘটিয়ে পেশাদারত্বের নবজাগরণ ঘটবে।

আরও পড়ুন

কিন্তু সেই আশা এখন দুরাশায় পরিণত হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে, কেবল রাজনৈতিক নেতাদের চেহারা বদলে গেছে, বাকি কাঠামো আগের মতোই রয়েছে।

পুরোনো অনুগ্রহভাজনদের জায়গায় নতুনরা আসছেন এবং পেশাদারত্বের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই সংবাদমাধ্যমের চরিত্র নির্ধারণ করছে।

এই সমস্যাটি আরও ঘনীভূত হয়েছে সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতির ভেতরে প্রোথিত এক ‘পুরস্কার প্রথা’র কারণে। যে সাংবাদিকরা কোনো দলের প্রতি আনুগত্য দেখান, তারা অনেক সময় ক্যারিয়ারের শেষে বা এমনকি ক্যারিয়ার চলাকালেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিদেশি মিশন, উপদেষ্টা পদ বা অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে পুরস্কৃত হন।

ভবিষ্যতের এই পুরস্কারের প্রত্যাশা আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা পরিবর্তনের অনেক আগেই ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা স্ব-নিয়ন্ত্রণ এবং সুবিধাবাদী রিপোর্টিংয়ের শক্তিশালী ব্যবস্থা তৈরি করে। ফলে নিউজরুমগুলো বৈচিত্র্যময় বিতর্কের বদলে মেরুকরণ এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আওয়াজ প্রতিধ্বনিত করার স্থানে পরিণত হয়।

দলীয় সমর্থকরা প্রায়ই বলেন যে, সাংবাদিকতায় নিরঙ্কুশ নিরপেক্ষতা একটি কল্পনা মাত্র। কারণ প্রতিটি সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তেই নির্দিষ্ট মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে। এটি সত্য হলেও পক্ষপাত এবং সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা অ্যাকটিভিজমের মধ্যে গুলিয়ে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।

একজন সাংবাদিকের দৃষ্টিভঙ্গি খবরের প্রেক্ষাপট নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু কোনো দলীয় প্রার্থীর হয়ে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালানো মানে বিশ্লেষণ ছেড়ে সরাসরি দলের কাজে অংশ নেওয়া।

এটি রাজনীতি বিশ্লেষণ করা এবং রাজনীতির অংশ হওয়ার মধ্যে বিদ্যমান মৌলিক পার্থক্য।

গণতান্ত্রিক তত্ত্বে সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয় কারণ এটি নির্বাহী বিভাগ ও দলীয় ক্ষমতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলাদা থাকে।

এই আলাদা সত্তাই সংবাদমাধ্যমকে ভুল ধরিয়ে দিতে, প্রচলিত বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করতে এবং প্রান্তিক মানুষের কথা তুলে ধরতে সহায়তা করে। সাংবাদিকরা যখন পেশা না ছেড়েই সংগঠিত দলীয় রাজনীতিতে যোগ দেন, তখন তারা কেবল নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাই হারান না, বরং সেই সামষ্টিক আস্থারও ক্ষতি করেন যার ওপর সাংবাদিকতা টিকে থাকে।

সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতেই পারে, এতে কোনো ভুল নেই। তারা নাগরিক হিসেবে অন্যের মতো সমান ভোটাধিকার ভোগ করেন। নৈতিক বিচ্যুতি তখনই ঘটে যখন সেই বিশ্বাসগুলো সাংবাদিকতা করতে গিয়েও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। সেই মুহূর্তে পেশার উদ্দেশ্যটিই মৌলিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কেউ একই সঙ্গে স্বাধীন পর্যবেক্ষক এবং রাজনৈতিক পদাতিক সৈনিক হিসেবে কাজ করতে পারেন না।

এই পরিস্থিতির পরিণতি এরই মধ্যে দৃশ্যমান। গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা ক্রমেই কমছে এবং তা কেবল রাষ্ট্রীয় চাপ বা ডিজিটাল অপপ্রচারের কারণে নয়। বরং পাঠকরা ক্রমেই সংবাদকে দলীয় সংঘাতের অংশ হিসেবে দেখছেন। সাংবাদিকতা যখন অন্য নামে প্রোপাগান্ডায় পরিণত হয়, তখন তা আর নাগরিকদের তথ্য সরবরাহ করে না; বরং এটি কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে প্ররোচিত করে, অপ্রিয় তথ্য গোপন করে এবং বিদ্যমান আনুগত্যকে আরও পোক্ত করে।

সাংবাদিকতা এবং রাজনীতি কখনো এক বিন্দুতে মিলবে কি না সেটা প্রশ্ন নয়ম বরং প্রশ্ন হলো মিললে সেটা কোন শর্তে।

কার্যকর গণতন্ত্রে যে সাংবাদিকরা রাজনীতিতে প্রবেশ করতে চান, তারা তাদের পেশার অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থেই সাংবাদিকতা ছেড়ে দেন। এই দেয়ালটি কোনো বিমূর্ত আদর্শ নয়, বরং জনআস্থা রক্ষার এক কার্যকর বর্ম।

এটি যখন ভেঙে পড়ে, সাংবাদিকতা তার স্বতন্ত্র গণতান্ত্রিক কার্যকারিতা হারায় এবং কেবল ক্ষমতার লড়াইয়ের আরেকটি ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়।

দেশের সাংবাদিকতাকে যদি হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে হয়, তবে এই সংকটের মুখোমুখি হতে হবে সাহসের সঙ্গে। এজন্য পেশাদার সংগঠনগুলোকে সুনির্দিষ্ট নৈতিক রেখা টানতে হবে, সংবাদ সংস্থাগুলোকে তা কার্যকর করতে হবে এবং সাংবাদিকদের নিজেদের একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কেউ চাইলে রাজনীতি করতে পারেন, অথবা সাংবাদিকতা। একই সঙ্গে দুটির চর্চা করা গণতন্ত্র বা জনগণের; কারও কল্যাণেই আসে না।

 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad