মার্কিন প্যাসিফিক ফ্লিট বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহর হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌ কমান্ড। এটি প্রায় ১০ কোটি বর্গমাইল এলাকা পাহারা দেয়, যা পুরো পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক।
উত্তর মেরুর বরফঢাকা অঞ্চল থেকে অ্যান্টার্কটিকা পর্যন্ত এবং আমেরিকার পশ্চিম উপকূল থেকে ভারতের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত এই বিশাল এলাকা জুড়ে এদের শক্তিশালী উপস্থিতি।
এই অঞ্চলে রয়েছে পুরো বিশ্বের মোট অর্থনীতির (জিডিপি) ৬০ শতাংশ এবং মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে সমুদ্রে যাতায়াত করা তেলের দুই-তৃতীয়াংশ এবং অন্যান্য পণ্যের এক-তৃতীয়াংশ যেসব পথ দিয়ে যায়, সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এই নৌ কমান্ড। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোতে এরা দিনরাত পাহারা দেয়।

এই বিশাল নৌবাহিনীর মূলে রয়েছে প্রায় ২০০টি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন। এর মধ্যে ৬টি বড় বিমানবাহী জাহাজ রয়েছে। এদের সহায়তা করার জন্য রয়েছে প্রায় দেড় হাজার যুদ্ধবিমান এবং দেড় লাখ সৈন্য ও বেসামরিক কর্মী।
তথ্যপ্রযুক্তির নতুন যুগে নেতৃত্ব
এই শক্তিশালী নৌ কমান্ডের প্রধান হলেন অ্যাডমিরাল স্টিফেন ‘ওয়েব’ কোহলার। অভিজ্ঞ এই বৈমানিক ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল হাওয়াইয়ের ঐতিহাসিক পার্ল হারবার কার্যালয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডার থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন। এফ-১৪ টমক্যাট এবং এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমানে তার ৩,৯০০ ঘণ্টারও বেশি ওড়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিমানবাহী জাহাজে ৬০০ বারেরও বেশি সফলভাবে বিমান অবতরণ করিয়েছেন তিনি।
অ্যাডমিরাল কোহলারের নেতৃত্বে এই নৌবহর প্রযুক্তির এক নতুন বিপ্লব ঘটাচ্ছে, যাতে যুদ্ধের ময়দানে তারা সবসময় এগিয়ে থাকতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং আধুনিক ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোহলার যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি একদম পরিষ্কারভাবে বোঝার ব্যবস্থা করেন। এর ফলে মানুষ এবং আধুনিক যন্ত্র একসাথে কাজ করে শত্রুর চেয়ে অনেক দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
এই আধুনিক ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো নৌবহরকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা, যাতে শত্রুপক্ষ যদি রেডিও যোগাযোগব্যবস্থাও অচল করে দেয়, তাহলেও এই বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে দ্রুত ও নিখুঁত হামলা চালাতে পারে।
আন্তর্জাতিক জোট ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে সবার জন্য মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে বিভিন্ন দেশের সাথে জোরদার বন্ধুত্ব ও সামরিক জোট তৈরি করা হয়েছে।

“রিমপ্যাক”-এর মতো বিশ্বসেরা সামরিক মহড়ার মাধ্যমে এই সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক যুদ্ধ অনুশীলন। ২০২৬ সালের রিমপ্যাক মহড়ায় ৩০টি দেশ অংশ নেয়। এই মহড়ায় চালকহীন যুদ্ধজাহাজ ও পানির নিচের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।
বিশেষ কিছু সামরিক দলের কারণে এই নৌবহরের ক্ষমতা আরও বেড়ে গেছে। যেমন জাপানের ওকিনাওয়ায় রয়েছে ‘৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’, যা এ ধরনের একমাত্র স্থায়ী অগ্রবর্তী বাহিনী। রয়েছে ‘বিচমাস্টার ইউনিট ১’, যারা সমুদ্র থেকে উপকূলে সৈন্য ও সরঞ্জাম নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে।
‘অকাস’ জোট এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে ত্রিপাক্ষিক সম্পর্কের মাধ্যমে প্যাসিফিক ফ্লিট নিজেদের আরও শক্তিশালী করছে। যেকোনো আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলা করতে এবং আন্তর্জাতিক আইন টিকিয়ে রাখতে তারা যুক্ত করছে নতুন প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ও অতি-দ্রুতগতির হাইপারসনিক অস্ত্র।


