হামের টিকা অকার্যকর হওয়ার গুঞ্জন ভিত্তিহীন: আইসিডিডিআরবি

হামের টিকা অকার্যকর হওয়ার গুঞ্জন ভিত্তিহীন: আইসিডিডিআরবি
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

হামের টিকা অকার্যকর হয়ে পড়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বর্তমান টিকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো অত্যন্ত কার্যকর এবং সুরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)।

সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক রূপ ধারণ করায় জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে, আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি একটি প্রশ্ন জোরালোভাবে ছড়াতে শুরু করে—চলতি হামের ভাইরাস কি কোনো জিনগত রূপান্তরের মাধ্যমে প্রচলিত টিকার সুরক্ষাবলয় এড়িয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে? এমন পরিস্থিতিতে আইসিডিডিআরবির এ গবেষণা সামনে এল।

সংস্থাটির অনুসন্ধানের প্রাথমিক ফলাফলে জানানো হয়েছে, প্রচলিত টিকা অকার্যকর হয়ে পড়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বর্তমান টিকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো অত্যন্ত কার্যকর এবং সুরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করছে। রোববার সংস্থাটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

আইসিডিডিআরবি এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা যৌথভাবে গত এপ্রিল ও মে মাসে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন।

এতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ল্যাব পরীক্ষায় ৩৪১ জন শিশুর মধ্যে ৩২৪ জনের শরীরে সরাসরি হাম নিশ্চিত হয়। বয়স ও টিকাদানের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিয়মিত টিকাদানের বয়স হয়নি এমন ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ জন শিশুর মধ্যে ১৪২ জন এবং টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ জন শিশুর মধ্যে ১২২ জন হামে আক্রান্ত ছিল।

অন্যদিকে, এক ডোজ টিকা পাওয়া ৪৮ জন শিশুর মধ্যে ৪৪ জন এবং সুপারিশকৃত পূর্ণ দুই ডোজ টিকা পাওয়া ২১ জন শিশুর মধ্যে ১৬ জন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়।

গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, দুই ডোজ প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে আক্রান্তের হার হাসপাতালভিত্তিক নির্দিষ্ট ২১ জন সন্দেহভাজন শিশুর ভেতরের পরিসংখ্যান। শূন্য সুরক্ষার শিশুদের আক্রান্তের হার যেখানে ৯৭ শতাংশের ওপরে, সেখানে দুই ডোজ প্রাপ্তদের আক্রান্তের হার কমে আসা এটাই প্রমাণ করে যে প্রচলিত টিকা শরীরে উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা বজায় রাখছে।

আরও পড়ুন

আইসিডিডিআরবি এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) যৌথভাবে ভাইরাসের ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণ ও ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করেছে।

এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি মূলত ‘বি৩’ উপশাখার অন্তর্ভুক্ত, যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া হামের উপাদানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ভাইরাসের কোষে প্রবেশের প্রধান মাধ্যম ‘এইচ প্রোটিন’-এ ৪টি মিউটেশন বা পরিবর্তন শনাক্ত হলেও হামের ভাইরাস এখনো একটি মাত্র ‘সেরোটাইপ’ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। ফলে টিকার মাধ্যমে মানবদেহে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি খুব সহজেই ভাইরাসটির বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

পূর্ণ দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশুর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ব্যক্তিভেদে অ্যান্টিবডি তৈরিতে তফাত, সময়ের সঙ্গে প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা অপুষ্টির মতো বিষয়গুলোকে ধারণা করা হচ্ছে বলেও গবেষণায় দেখানো হয়েছে।

গবেষণায় কম বয়সী শিশুদের একটি বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশে নিয়মিত কর্মসূচির আওতায় শিশুদের ৯ মাসে প্রথম এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ পাওয়ার আগে শিশুরা মূলত মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি এবং সমাজের সামষ্টিক সুরক্ষার ওপর নির্ভর করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই শিশুদের শরীর থেকে মায়ের দেওয়া অ্যান্টিবডি দ্রুত কমতে থাকে। এর ফলে তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুরা সংক্রমণের তীব্র ঝুঁকিতে পড়ছে, যা নিয়ে বিজ্ঞানীরা আরও বিস্তারিত গবেষণা চালাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে দেড় লক্ষাধিক সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে এবং মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে ৯৫ জনের।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান ও নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ জানান, টিকাদানের হার ভালো হওয়া সত্ত্বেও কেন এই প্রাদুর্ভাব এত বড় হলো এবং নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করতে চার বিভাগীয় হাসপাতালে বিস্তৃত কোহর্ট ও কমিউনিটিভিত্তিক গবেষণা শুরু হয়েছে।

একই সঙ্গে গবেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, কোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্যে কান দিয়ে শিশুদের টিকাদান বিলম্বিত বা বাতিল করা যাবে না। প্রতিটি শিশুর বয়স অনুযায়ী হাম-রুবেলা টিকার সবকটি ডোজ নিশ্চিত করাই এই রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad