বাংলাদেশের রাজনীতি একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা যায় না, কারণ দীর্ঘদিনের ‘শত্রু’ বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক সময়কার প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যকার নতুন নির্বাচনী জোট বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ধর্মভিত্তিক দল দুটির নেতারা এখন উপলব্ধি করছেনে যে, বিচ্ছিন্ন থাকলে জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতিতে ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। কারণ, সরকার এবং অন্য বড় রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে দাবি আদায়ে চাপ সৃষ্টিতে শক্তির কোনো বিকল্প নেই।
এছাড়া জোটবদ্ধ প্রার্থী দিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনে বড় দল বিএনপিকে চাপে রাখার ভাবনাও দল দুটির ঐক্যে বিশেষ শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা বলছেন, গতানুগতিক রাজনীতিক দলের ব্যর্থতায় ইসলামীপন্থীদের প্রতি মানুষের ঝুঁকে পড়ার আকাঙ্খা থেকেই তারা ঐক্য গড়ছেন। তাদের ঐক্য বিশেষ শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ও দলের মিডিয়া এবং প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার উদ্দেশেই এই ঐক্য নয়। জোটবদ্ধ থাকলে ভোটসহ নানা দাবি আদায়ে এক ধরনের শক্তি কাজ করে। সেই ভাবনা থেকেই জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ অনেকেই এখন এককাতারে।’
জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের ‘অস্বাভাবিক’ বন্ধুত্বের কারণ তথ্যানুসন্ধান করতে গিয়ে পাওয়া গেল বেশ মজার তথ্য।
দলদুটির বেশ কয়েকজন নেতা বলেন, গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ইসলামী দলগুলোকে ব্যবহার করে। পরে যখন প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় তখন ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মীদের উল্টো নির্যাতনের শিকার হতে হয়। যেহেতু ধর্মভিত্তিক প্রতিটি দলই চায় দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, তাই আদর্শিক বিষয়ে ছাড় দিয়ে হলেও দলগুলো ঐক্যে জোর দিচ্ছে।
এক্ষেত্রে দলগুলো নিকট অতীতের বেশকিছু উদাহরণ সামনে আনছে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের ক্ষমতার প্রায় সাড়ে ১৫ বছরে দেশে সব ঘরানার আলেমরাই নানা ইস্যুতে হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন।
বিশেষ করে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি দমনের পর কওমী বা আলিয়া উভয় ঘরানার আলেমদের গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। আর ওই ঘটনার পর ইসলামীপন্থীরা নতুন করে ভাবতে শুরু করেন।
এরপর গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইসলামীপন্থীরা সুদৃঢ় অবস্থান নিতে শুরু করেন। গণঅভ্যুত্থানে দলগুলোর ইতিবাচক ভূমিকা লাগাতে কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে ওঠে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন।
‘মওদুদীবাদ মতাদর্শ’নিয়ে জোরালো আপত্তির পরও জামায়াতের আহ্বানে ‘কওমি’ আলেমদের পাশাপাশি নানা ঘরানার ইসলামী দলের নেতারা সাড়া দিতে থাকেন। ইসলামী আন্দোলনও সভা-সেমিনার শুরু করে। নির্বাচনী ঐক্য এবং আদর্শিক দূরত্ব কমানোই ছিল যার মূল লক্ষ্য।
ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘অতীতে বড় তিন দলের দেশ পরিচালনার সময়ে অন্যায়, অনিয়ম ও চাঁদাবাজিতে সাধারণ মানুষ হতাশ। জনগণ এখন ইসলামীপন্থীদের প্রতি ঝুঁকেছেন। সেই জায়গা থেকেই আমরা জামায়াতসহ অন্যদলের সঙ্গে ঐক্য বা নির্বাচনী জোট করছি। নিজেদের ঐক্য, জোটবদ্ধ ভোট এবং সবশেষ পাঁচ তফা দাবিতে যুগপৎ কর্মসূচির সিদ্ধান্তে ব্যাপক সাড়া জেগেছে।’
গত ২১ জানুয়ারি বরিশালে চরমোনাই পীর ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির এবং জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের বৈঠকটি ছিল দল দুটির ঐক্যের টার্নিং পয়েন্ট। এছাড়া গত ১৯ জুলাই ঢাকায় জামায়াতের এবং ২৮ জুন ইসলামী আন্দোলনের জাতীয় সমাবেশে দল দুটির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি এই ঐক্য প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনকে আওয়ামী লীগের সহযোগী আখ্যা দিয়ে জামায়াত নেতারা বক্তব্য দিতেন। আবার ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমও বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে ‘মাঠ গরম করা’ বক্তব্য দেওয়ার জন্য বেশ আলোচিত ছিলেন। সে সময় পর্যন্ত দল দুটিই পরস্পরকে ‘ইসলামের শত্রু’বলে আখ্যা দিত।
তবে সরকার পতনের পর দল দুটি নেতারা এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া থেকে সরে এসেছেন। বরং সম্প্রতি চরমোনাই পীরকে নিয়ে বিএনপির এক নেতার বিতর্কিত মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
পাশাপাশি দেশের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবিরের বিজয়ে চরমোনাই পীরও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচনের কমিশনের নিবন্ধিত এই রাজনৈতিক দল দুটি এখন নানা দাবি আদায় এবং আগামী নির্বাচন ইস্যুতে মাঠে তৎপর। বিশেষ করে সবশেষ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের প্যানেলের ‘নিরঙ্কুশ’ বিজয় তাদেরকে আরও আশাবাদী করে তুলেছে।
এখন জোটবদ্ধভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ফলাফলে চমক দেখাতে চায় দল দুটি।
এই দুই দলের শীর্ষ নেতারা নির্বাচনে জোটবদ্ধ প্রার্থী দিয়ে বড় দল বিএনপিকে চাপে ফেলতে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। দুটির দলের ভোট একবাক্সে গেলে অনেক আসনেই অন্য দলকে চ্যালেঞ্জে ফেলা যাবে বলেও মনে করছেন জামায়াত জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।


