দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রতীক্ষা শেষে দেশের মাটিতে ফিরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪৪ মিনিটে তাকে বহনকারী বিমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখানে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা তাকে স্বাগত জানান।
বিমানবন্দর থেকে রাজধানীর ৩০০ ফিটে যে সংবর্ধনা মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে তার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন তারেক রহমান। তাকে ‘ঐতিহাসিক ও রাজকীয় সংবর্ধনা’ দিতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
এদিকে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে আসার খবরে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। দুইদিন আগে থেকে ঢাকায় সংবর্ধনা স্থলে আসতে শুরু করেন জেলা ও উপজেলার নেতাকর্মীরা।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে বরণে সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাগত মিছিল ও প্রস্তুতি সভা করা হয়েছে কয়েকদিন আগে থেকেই। বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয় ১০টি রুটে। দলটির লক্ষ্য ছিল বিমানবন্দরসহ গোটা ঢাকা জনসমুদ্রে পরিণত করা।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর পর বৃহস্পতিবার দেশে ফিরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সংবর্ধনায় লাখ লাখ মানুষের মহামিলন প্রমাণ করে তিনি দেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নেতা।’
তার সফরসঙ্গী রয়েছেন- সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, দলের মিডিয়া টিমের প্রধান আবু আবদুল্লাহ সালেহ, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবদুর রহমান সানি ও তাবাসসুম ফারহানা।
বিমানবন্দর থেকে সরাসরি সংবর্ধনাস্থলে ৩০০ ফিটে যান তারেক রহমান। এরপর সংবর্ধনা শেষে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যাবেন এবং সেখান থেকে গুলশানে মায়ের বাসায় উঠবেন।
তারেক রহমানের নিরাপত্তার জন্য বুলেটপ্রুফ গাড়ি কেনা হয়েছে তা বিমানবন্দরে রয়েছে। এছাড়াও টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো এলসি ২৫০ মডেল গাড়িও বিমানবন্দরে নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া তারেক রহমানের বাসভবন ও অফিসেও থাকবে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়া কাউকে তার কাছে যেতে দেওয়া হবে না। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও ছদ্মবেশে গোয়েন্দারা তারেক রহমানের নিরাপত্তার দিকটি দেখভাল করছেন।
পাশাপাশি বিমান বন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত দলের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তার নেতৃত্বে চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্সসহ একাধিক টিম কাজ করছে। এ ছাড়া দলের বিশ্বস্ত নেতাকর্মীদের সমন্বয়েও একটি টিম গঠন করা হয়েছে।
বিএনপি সূত্র জানায়, তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রেড, ইয়েলো ও হোয়াইট-এই তিন জোনে ভাগ করে সাজানো হয়েছে নিরাপত্তার ছক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ) রয়েছো নিয়োজিত।
এর আগে, তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। কেবল যাত্রীরাই এই সময়ে প্রবেশ করতে পারবেন।
বিশ্বরোড থেকে পূর্বাচলমুখী ৩০০ ফিট সড়কের একটি অংশজুড়ে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। ৪৮ ফুট দীর্ঘ, ৩৬ ফুট প্রসস্ত ও সড়ক থেকে ৮ ফুট উঁচুতে এ মঞ্চ। প্রায় ৯০০ মাইক লাগনো হবে রাজধানীতে। এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে আবদুল্লাহপুর, বিশ্বরোড, বনানী হয়ে মহাখালী, যমুনা ফিউচার পার্ক, ৩০০ ফিটের রাস্তা ধরে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত লাগানো হয়েছে এসব মাইক। পুরা এলাকার সিসি টিভির নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ ও অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা।
দলীয় নেতারা জানান, তারেক রহমানের দেশে ফেরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘তারেক রহমানের দেশে ফেরা দেশের জন্য খুব ইতিবাচক। কারণ দেশ আসলে এই মুহূর্তে আসলে নেতৃত্ব শূণ্যতায় রয়েছে। তিনি এসে যদি জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন তাহলে এবং তার দলের নেতাকর্মীদের যদি মধ্যে শৃ্ঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারেন তাহলে তিনি জাতীয় নেতার আসন পাবেন। এছাড়া জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণদের চাওয়াকে বিশেষ প্রধান্য তাকে দিতে হবে।’
তবে, সঠিকভাবে দল নিয়ন্ত্রণ বা জাতীয় ঐক্য গড়তে না পারলে বিপরীতটা হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন প্রফেসর দিলারা চৌধুরী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, ‘তারেক রহমানের আগমন দেশের জন্য ভালো বার্তা। তার প্রত্যাবর্তনের ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’
বুধবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দুইদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। ৩০০ ফিটে তাকে অভ্যর্থনা জানানোর পর মা খালেদা জিয়াকে দেখতে যাবেন এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখান থেকে পরে গুলশানের বাসভবনে যাবেন।
এরপর শুক্রবার জুমার নামাজের পরে জিয়াউর রহমানের মাজারে যাবেন তারেক রহমান। সেখান থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন তিনি।
পরদিন শনিবার ভোটার তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভূক্ত করতে যাবেন নির্বাচন ভবনে এবং জুলাই আন্দোলনে আহতদের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন পঙ্গু হাসপাতালে। একইদিন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করতে যাবেন তারেক রহমান।


