আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বছরের পর বছর ধরে চলা লুটপাট এবং রাজনৈতিক প্রভাবে দেওয়া ঋণের কারণে ধ্বংসের কিনারায় চলে গিয়েছিল ব্যাংকিং খাত। পরে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্যের কারণে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে।
এই সংকট নতুন কোনো লোকসানের কারণে যতটা না হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেওয়া সংকেতের কারণে, যা আমানতকারীদের আচরণ রাতারাতি বদলে দিয়েছিল।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া কিছু পদক্ষেপ, বিশেষ করে নগদ টাকা উত্তোলনের ওপর সীমা আরোপ করার বিষয়টি আমানতকারীদের আতঙ্কিত করে তোলে। গভর্নর আহসান এইচ মনসুর যখন প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করার জন্য নতুন করে আর কোনো টাকা ছাপানো হবে না, তখন এই আতঙ্ক আরও গভীর হয়।
যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরবর্তীতে এই ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থ জুগিয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। বেশ কয়েকটি ব্যাংক বছরের পর বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর টিকে ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ও গভর্নরের বক্তব্যে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। এর ফলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়ে। ব্যাংকের সামনে লম্বা লাইন তৈরি হয়। দেখা দেয় নগদ টাকার সংকট। গ্রাহকরা তাদের সঞ্চয় ফিরে পাওয়ার আশায় দিনের পর দিন ব্যাংকে যেতে থাকেন।
ব্যাংকিং খাতের এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ন্যাশনাল, এক্সিম এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকসহ নয়টি ব্যাংক। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠিত হয়েছে।
টাইমস অব বাংলাদেশ এই পরিস্থিতি নিয়ে অন্তত এক ডজন শীর্ষ ব্যাংকারের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা সবাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, একটি ব্যাংকের প্রধান সম্পদ টাকা নয় বরং মানুষের আস্থা। যখন কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রকাশ্যে একটি ব্যাংককে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করে বা তার দুর্বল আর্থিক অবস্থা প্রকাশ করে দেয়, তখন গ্রাহকরা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন।
একটি সমস্যায় পড়া ব্যাংকের চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পৃথিবীর কোথাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা প্রকাশ্যে এত কথা বলেন না। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আতঙ্ক এড়াতে সব ধরনের সংশোধনমূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সামলানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ভয় তৈরি এবং আস্থা ধ্বংস করার এক প্রতিযোগিতা চলেছে।
তার অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব এই দায় এড়াতে পারেন না। একটি শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকের একজন সাবেক স্পন্সর-ডিরেক্টর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের আস্থা নষ্ট না করলে একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে অন্তত দুটি ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে পারত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি যখন গভর্নরের দায়িত্ব নিই, তখন আমাদের কোনো ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স ছিল না। আমাদের কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না। এমনকি আমরা কোনো কৌশলও তৈরি করিনি।’ এই কারণেই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়েছে বলে তিনি জানান।
আস্থা কমে যাওয়ার ধারাবাহিক চিত্র
ব্যাংকিং খাত প্রথম বড় ধাক্কা খায় ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট, যখন বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ টাকা তোলার ওপর সীমা আরোপ করে। যদিও এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সহযোগীরা যাতে টাকা সরিয়ে নিতে না পারে সেই উদ্দেশ্যে। কিন্তু এর প্রায়োগিক প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক। আমানতকারীদের কাছে এই বার্তাটি ছিল পরিষ্কার যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে গেছে।
২০ আগস্ট আস্থা আরও কমে যায় যখন গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করার জন্য বাড়তি কোনো টাকা ছাপাবে না। এসব ব্যাংকে গ্রাহকদের টাকা জমা রাখা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক এর দায় নেবে না।
২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আস্থার সংকট আরও বেড়ে যায় যখন গভর্নর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রায় দশটি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার দিকে যাচ্ছে এবং সেগুলোকে একীভূত করা হতে পারে।
তবে চরম সংকটের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার অবস্থান বদলায়। দুই সপ্তাহের মধ্যে গভর্নর সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য একটি বিশেষ তারল্য প্যাকেজ ঘোষণা করেন। ২২ সেপ্টেম্বর ন্যাশনাল, ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী এবং সোশ্যাল ইসলামী–এই পাঁচটি ব্যাংককে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের সঙ্গে চুক্তি সই হয়।
ব্যাংকগুলো তখন এমনিতেই গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছিল তখন দুর্বল ব্যাংকের তকমা দেওয়ার পর মানুষের আস্থা আরও কমে যায়।
২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে যে, নয়টি ব্যাংকের সম্মিলিত চলতি হিসাবের ঘাটতি ১৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ন্যাশনাল, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স, পদ্মা এবং আইসিবি ইসলামিক–তালিকায় নামগুলো যেভাবে সুনির্দিষ্টভাবে দেওয়া হয়েছিল তা ছিল নজিরবিহীন।
১ অক্টোবর থেকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত দুর্বল ব্যাংকগুলোতে প্রায় ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তহবিলসহ মোট ধারের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫২ হাজার কোটি টাকায়। তবুও এই টাকা ব্যাংকে থাকেনি। আমানতকারীরা টাকা তুলে নিলেও পুনরায় জমা করেননি। ফলে টাকার চক্রাকার প্রবাহ ভেঙে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে দেখা যায়, তারল্য ও গ্যারান্টি সহায়তার আওতায় সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ৭ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে। কিন্তু রেকর্ড অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত শুধুমাত্র এক্সিম ব্যাংকই প্রায় ১১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার আমানত হারিয়েছে। সেপ্টেম্বর নাগাদ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক প্রায় ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা আমানত হারায়।
তবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ব্যাংকিং খাতের সংকটকালীনও তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করেছে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যাংকের বিশাল গ্রাহক ভিত্তি এবং একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সমর্থন একে সাহায্য করেছে। গভর্নরও বারবার প্রকাশ্যে এই ব্যাংকের পক্ষে কথা বলেছেন, যা ব্যাংকটির প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে প্রকাশ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, আবার অন্যদিকে চড়া সুদে ঋণ দিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে ঋণী করে ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর টাইমস’কে বলেন, ‘আমরা তাদের ২২ হাজার কোটি টাকা দিয়েছি। তাদের শোধ করার ক্ষমতা ছিল না। সেই কারণেই আমরা তাদের অধিগ্রহণ করেছি।’
একীভূতকরণ পরিকল্পনা কি সফল হবে?
২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল গভর্নর জানান, দেশের দশটি ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে অনেকগুলোই দুর্বল এবং সেগুলোকে একীভূত করা হবে। ১৫ জুন তিনি জানান, এক্সিম এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের স্বাধীনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও পাঁচটি শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংক–ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন, সোশ্যাল ইসলামী এবং এক্সিমকে মিলিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিপত্র অনুযায়ী, এক্সিম ব্যাংক কোনো আর্থিক সহায়তা ছাড়াই শুধু দুই বছর সময় চেয়েছিল। আর ১০ বছরের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ চেয়ে পরিকল্পনা জমা দিয়েছিল সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি একীভূতকরণের দিকে এগিয়ে যায়।
কোনো কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশ হলেও তাদের বাদ দিয়ে ৪৮ শতাংশ ও ৬৩ শতাংশ খেলাপি ঋণের এক্সিম এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে কেন একীভূত করার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো-এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টাইমসকে বলেন, অন্য সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলো শরিয়াহ ভিত্তিক ছিল না।
এই প্রক্রিয়াটি আদৌ একীভূতকরণ কি না তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, এটি ‘একীভূতকরণ এবং অবসায়নের মাঝামাঝি একটি প্রক্রিয়া।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডজনেরও বেশি কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে জানান, তারা এই পদ্ধতির সঙ্গে একমত নন। কিন্তু তারা গভর্নরের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে চাননি। গত বছর ৫ নভেম্বর এসব ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, এসব ব্যাংকের ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের নিট সম্পদ মূল্য এখন মাইনাস ৩৫০ থেকে ৪২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। যার ফলে শেয়ারহোল্ডারদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠেছে এক্সিম ব্যাংককে নিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব রেটিং অনুযায়ী ২০২০, ২০২১ এবং ২০২৩ সালে এক্সিম ব্যাংক শীর্ষ দশটি ‘টেকসই ব্যাংকের’ তালিকায় ছিল। পরবর্তীতে যখন গভর্নর বলেন, এক বছরের মধ্যেই এর বুক ভ্যালু বা বইয়ের হিসাব অনুযায়ী মূল্য ঋণাত্মক হয়ে গেছে, তখন শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেওয়া আশ্বাসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আদিল রহমান নামে একজন বিনিয়োগকারী বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এই রেটিং দেখেই বিনিয়োগ করেছিলাম। আজ আমরা নিঃস্ব। এর দায় কে নেবে–আমরা নাকি বাংলাদেশ ব্যাংক?’
আব্দুল হালিম নামে আরেক বিনিয়োগকারী বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতায় লুটপাটের কারণেই ব্যাংকের এই দশা হয়েছে। অথচ সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সাজানো রিপোর্ট দেখে বিভ্রান্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, প্রকৃত সমন্বয় ছাড়া এই পাঁচটি ব্যাংক ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারপারসন ফারুক মঈনউদ্দীন আহমেদ বলেন, টেকসই সমাধান খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত পাঁচটি ছোট গর্ত মিলে একটি বিশাল গর্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।


