গত মঙ্গলবার বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির স্পষ্ট জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তিটি বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই। তবে তিনি জানিয়েছেন, চুক্তির কিছু নির্দিষ্ট ধারা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ থাকতে পারে।
একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান মন্তব্য করেছেন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা চুক্তিগুলোর তুলনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের চুক্তিটি ব্যতিক্রম কিছু নয়।
প্রকৃতপক্ষে, প্রতিটি চুক্তির মধ্যেই এক ধরনের অদ্ভুত অসমতা ও সাদৃশ্য বিদ্যমান। শুল্ক কমানোর বিনিময়ে এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য এবং কৃষিপণ্য কেনার কঠিন শর্ত মেনে নিয়েছে।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করে। তবে এর কিছু শর্ত ঢাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশলগত স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিয়েছে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার মতো ‘অ-বাজার’ অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে লেনদেনে বাধা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার বাধ্যবাধকতা ঢাকাকে চাপে ফেলেছে। এ ছাড়া জ্বালানি সংগ্রহের কঠোর নিয়মগুলোও বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই চুক্তি কেবল রপ্তানি বাড়াবে কি না সেটি মূল প্রশ্ন নয়। বরং এর ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধানগুলো বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতাকে কতটা খর্ব করছে সেটিই এখন বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। মার্চ মাসের শুরুতে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস পল কাপুর ঢাকা সফর করেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পূর্বশর্ত হলো এই চুক্তি কঠোরভাবে মেনে চলা। একই সঙ্গে তিনি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমন্বয়ের ওপরও জোর দেন।
এই চুক্তির আওতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ইতোমধ্যে ৩৭০ কোটি ডলার বা ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যে ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার চুক্তি সই করেছে। এ ছাড়া আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। পাঁচ বছর ধরে বার্ষিক ৭ লাখ টন গম এবং ১২৫ কোটি ডলারের সয়াবিন আমদানির অঙ্গীকারও করা হয়েছে। কৃষি ও জ্বালানি খাতে এই সম্মিলিত প্রতিশ্রুতির পরিমাণ প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার।
এর বাইরে ঢাকাকে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে এবং চীন ও রাশিয়া থেকে আমদানি কমিয়ে আনতে হবে। এমনকি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য বা ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করার সময় এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও মার্কিন অগ্রাধিকার বিবেচনা করতে হবে।
‘এআরটি’ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত পণ্যের নিয়মাবলির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এটি মূলত রাশিয়া সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা এবং চীন কেন্দ্রিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে ঢাকাকে আমেরিকার অবস্থানের সঙ্গে একাত্ম হতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে রাশিয়ার সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প এবং চীনের অর্থায়নে চলা প্রকল্পগুলো চালু রাখা বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান তারেক রহমান সরকার চুক্তিটি এগিয়ে নিতে আগ্রহী হলেও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এর ক্ষতিকারক ধারাগুলো বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
সিপিডি এই চুক্তিকে ‘চরম বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে এবং অর্থনীতিবিদরা এ বিষয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি তুলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ভারত চুক্তি
২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের ওপর মার্কিন শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করার ঘোষণা দেন। যদিও পূর্ণাঙ্গ চুক্তিটি এখনো সই হয়নি, তবে এর বর্তমান কাঠামোটি ভারতের বিরোধী দলগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, মোদি সরকার শুল্ক হ্রাস এবং জ্বালানি ক্রয়ের ক্ষেত্রে মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে। তারা মনে করছে, ভর্তুকিপ্রাপ্ত সস্তা মার্কিন দুগ্ধ ও কৃষিপণ্য ভারতীয় কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি করবে।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতি অনুযায়ী, ভারত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য ও পরিষেবা কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমানে এর পরিমাণ বার্ষিক মাত্র ৪৫ বিলিয়ন ডলার। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভারত রুশ তেল আমদানি বন্ধ করে মার্কিন ও ভেনেজুয়েলার জ্বালানি গ্রহণ করবে, যদিও ভারত এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে ১৮ শতাংশ শুল্ক হার পাকিস্তান বা ভিয়েতনামের তুলনায় ভারতের জন্য কিছুটা সুবিধাজনক। জেনেরিক ওষুধের ওপর শূন্য শুল্ক ভারতের ওষুধ শিল্পের জন্য বড় সুযোগ নিয়ে আসবে।
এই চুক্তি ২০২৫ সালের ‘শানটি অ্যাক্ট’ ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতের পারমাণবিক খাত উন্মুক্ত করা এবং মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যকেও সমর্থন করে। বোয়িং ও লকহিড মার্টিনের মতো সংস্থাগুলো এখন ভারতে যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। তবে ডেটা সুরক্ষা এবং ডিজিটাল করের মতো বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ভিয়েতনাম
২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যের রূপরেখায় সম্মত হয়। ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ ভিত্তি শুল্ক ধার্য করা হয়েছে, যদিও নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে শুল্ক ছাড়ের আলোচনা চলছে। ভিয়েতনাম নকল পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং স্পেসএক্স-এর স্টারলিংক পরিষেবাকে অনুমোদন দিয়েছে। দেশটি ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বোয়িং বিমান কিনতে রাজি হয়েছে এবং ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের একটি গলফ কোর্সের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এমনকি তারা এফ-১৬ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও এগোচ্ছে।
তবে ভিয়েতনামের বড় দুশ্চিন্তা হলো তাদের উৎপাদিত পণ্যের কাঁচামালের একটি বড় অংশ আসে চীন থেকে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য যুদ্ধ তীব্র হলে ভিয়েতনাম সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তি চূড়ান্ত করেছে যেখানে মার্কিন শুল্ক ৩২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে পাম তেল ও কফিসহ ১৮০০-এর বেশি পণ্য শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পাবে। বিনিময়ে ইন্দোনেশিয়া প্রায় সব মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেবে এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানির কড়াকড়ি শিথিল করবে। জাকার্তা ৩৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি ও কৃষিপণ্যও রয়েছে। এ ছাড়া তারা মার্কিন প্রকল্পে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে সহায়তা করবে এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন স্বার্থবিরোধী কোনো নীতি গ্রহণ করবে না। জাকার্তাকে অবশ্যই তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দাবি যে অন্য দেশগুলোও একই শর্ত মেনে নিয়েছে—তা মোটেও আশ্বস্ত হওয়ার মতো নয়। যদিও এই চুক্তিগুলো মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেয়, কিন্তু বিনিময়ে প্রতিটি দেশকেই বিশাল নীতিগত ছাড় দিতে হয়েছে। এই চুক্তিগুলো দেশগুলোর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করছে।
এটি পরিষ্কার, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় তার নিজস্ব বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে সবার আগে দেখে। এর ফলে এশীয় দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।


