নির্বাচনী ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভোটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের সম্ভাব্য সম্মিলিত খরচ ধরা হয়েছে তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
এটি গত নির্বাচনের চেয়ে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০১৮ সালের ১১তম সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৫০ শতাংশ। নির্বাচন কমিশন বলছে, সংসদীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট এবং পোস্টাল ব্যালট যুক্ত হওয়ায় খরচ এই পরিমাণে বেড়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সূত্র অনুযায়ী, বরাদ্দের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হবে আইনশৃঙ্খলা খাতে। প্রাথমিকভাবে এই খাতে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। তবে এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে আনসার বাহিনী সবচেয়ে বেশি ৫৪৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা পাচ্ছে। এরপর পুলিশ পাচ্ছে ২৭০ কোটি ২১ লাখ টাকা। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর জন্য মোট বরাদ্দ ১৮৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ১৪৮ কোটি ৫৮ লাখ, নৌবাহিনী ২৩ কোটি ৩৭ লাখ ও বিমানবাহিনী ১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা পাবে।
অন্যান্য বরাদ্দের মধ্যে বিজিবি একশ’ কোটি ১৭ লাখ ও কোস্ট গার্ড ৩৩ কোটি সাত লাখ টাকা পাবে। র্যাব পাচ্ছে ২১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা আর ১৫ কোটি আট লাখ টাকা পাবে গ্রাম পুলিশ।
এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস এক কোটি, এনটিএমসি ৫২ লাখ এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ৫৫ লাখ টাকা পাচ্ছে। ডিজিএফআই দুই কোটি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা খাতে এখন পর্যন্ত মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৭৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, নির্বাচন পরিচালনার জন্য কমিশন আরও এক হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। সূত্র জানায়, বাহিনীর সদস্য ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৈনিক ভাতার জন্য ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সরকারি যানবাহনের জ্বালানি বাবদ ২৯৮ কোটি এবং ভাড়া করা গাড়ির জন্য ২০১ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। পণ্য ক্রয়ের জন্য ৫৮১ কোটি, সম্মানী ভাতার জন্য ৫১৫ কোটি এবং সরঞ্জাম ও আনুষঙ্গিক খাতে ১৬২ কোটি টাকা খরচ হবে। ছাপা ও বাঁধাই কাজের জন্য ১০৮ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
অতিরিক্ত বরাদ্দের মধ্যে ভ্রমণ ভাতা ১০৯ কোটি এবং বিজ্ঞাপন ও প্রচারের জন্য ১০৩ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। আপ্যায়ন খাতে ১৮৪ কোটি, পরিবহন খরচে ৮০ কোটি এবং অস্থায়ী শ্রমিকদের মজুরি বাবদ ৩১ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
কমিশনের নিজস্ব খরচ ছাড়াও কয়েকটি মন্ত্রণালয় গণভোটের প্রচারের নামে তহবিল নিচ্ছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪৬ কোটি এবং তথ্য মন্ত্রণালয় চার কোটি ৫২ লাখ টাকা নিয়েছে। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ছয় কোটি ৯৮ লাখ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় চার কোটি ৫২ লাখ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় চার কোটি ৩৪ লাখ টাকা নিয়েছে। গণভোটের প্রচারে আলাদাভাবে চার কোটি টাকা ব্যয় করছে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখা।
এলজিইডি সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার জন্য কমিশন থেকে ৭০ কোটি টাকা নিয়েছে। গণভোটের ব্যালট ছাপানোর খরচ ধরা হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। ১২৩টি দেশ থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৩৪ হাজার প্রবাসী ভোটার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। সরকার প্রতি ভোটের জন্য গড়ে ৭০০ টাকা ব্যয় করছে। দশ লাখের বেশি প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ভোটের চার-পাঁচ দিন আগে এই প্রশিক্ষণ শেষ হবে এবং এতে খরচ হবে প্রায় সাত কোটি টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের জন্য তারা তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা পেয়েছেন। এই টাকা ব্যালট পেপার, জনবল, পরিবহন এবং অন্যান্য নির্বাচনী সরঞ্জাম খাতে ব্যয় হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা চেয়েছিল। তবে প্রাথমিকভাবে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা অনুমোদন করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে এটি আরও বাড়ানো হতে পারে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, গণভোটের প্রচারের জন্য মন্ত্রণালয়গুলোর তহবিল নেওয়া একটি নজিরবিহীন ঘটনা। প্রচারের আড়ালে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় একশ’ কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রাহমানিল মাসুদ টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনী ব্যয় কমানোর পক্ষে। তারা খরচ কমানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু গণভোট এবং পোস্টাল ব্যালটের কারণে খরচ বেড়ে গেছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়গুলো কমিশনের মাধ্যমে তহবিল নেওয়ায় ব্যয় আরও বেড়েছে।
অতীতের নির্বাচনের ব্যয়
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ১২তম সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য ব্যয় ছিল দুই হাজার ২৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা খাতে এক হাজার ২২৫ কোটি ৬২ লাখ এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় এক হাজার ৫০ কোটি ছয় লাখ টাকা ধরা হয়েছিল। তবে কমিশনের তথ্য মতে, প্রকৃত ব্যয় হয়েছিল এক হাজার ৯২৭ কোটি টাকা।
২০১৮ সালের ১১তম নির্বাচনে খরচ হয়েছিল ৭০০ কোটি টাকার বেশি। ২০১৪ সালের ১০তম নির্বাচনে খরচ ছিল ২৬৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ওই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ায় মাত্র ১৪৭টি আসনে ভোট হয়েছিল।
এর আগের নির্বাচনগুলোর মধ্যে ২০০৮ সালে ১৬৫ কোটি এবং ২০০১ সালে ৭২ কোটি ৭১ লাখ টাকা খরচ হয়। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে ১১ কোটি ৪৭ লাখ এবং ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ৩৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল।
এ ছাড়া ১৯৯১ সালে ২৪ কোটি ৩৭ লাখ, ১৯৮৮ সালে পাঁচ কোটি ১৫ লাখ ও ১৯৮৬ সালে পাঁচ কোটি ১৬ লাখ টাকা খরচ হয়। ১৯৭৯ সালে খরচ ছিল দুই কোটি ৫২ লাখ টাকা। আর ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।


