দেশে যক্ষ্মা, এইচআইভি/এইডস ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৭১৮ জন রোগীকে শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ফুসফুসের যক্ষ্মা রোগীদের সংস্পর্শে আসা প্রায় ১৫ লাখ মানুষকে দেওয়া হবে যক্ষ্মা প্রতিরোধী চিকিৎসা (টিপিটি)। প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রায় রোগীদের জন্য পুষ্টি সহায়তার সুবিধাও রাখা হয়েছে, যার আওতায় পড়বেন ৮ লাখ ২৪ হাজার ৪৫০ জন যক্ষ্মা রোগী, ৯ হাজার ৪০০ জন এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ১ হাজার ৮৩০ জন ম্যালেরিয়া রোগী।
‘ইন্টিগ্রেটেড হেলথ সিস্টেম রেসপন্স টু ফাইট এগেইনস্ট টিবি, এইচআইভি/এইডস অ্যান্ড ম্যালেরিয়া ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। অনুমোদনের জন্য এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন হচ্ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে ৩ হাজার ১৬৮ কোটি ৮৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং বৈদেশিক অনুদান হিসেবে পাওয়া যাবে ৮৭০ কোটি ১৭ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। এই অনুদান দেবে ‘দ্য গ্লোবাল ফান্ড টু ফাইট এগেইনস্ট এইডস, টিউবারকিউলোসিস অ্যান্ড ম্যালেরিয়া’ (গ্লোবাল ফান্ড)।
প্রকল্পের আওতায় শতভাগ শনাক্তকৃত যক্ষ্মা রোগীর রিফ্যাম্পিসিন সংবেদনশীলতা পরীক্ষা এবং নতুন ও পুনরায় আক্রান্ত সব যক্ষ্মা রোগীর এইচআইভি পরীক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
এ ছাড়া দেশে শনাক্ত হওয়া প্রায় ১৭ হাজার ৭০০ এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তির মধ্যে ৮৫ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনা এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের ৯৩ শতাংশের ‘ভাইরাল লোড’ নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও ধরা হয়েছে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ প্রতি হাজারে একের নিচে নামিয়ে আনা এবং ২০২৯ সালের মধ্যে এর ফলে মৃত্যু শূন্যে আনার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি, ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত গর্ভবতী নারীদের প্রসবপূর্ব সেবার সময়ে শতভাগকে একাধিক ক্ষুদ্র পুষ্টি উপাদান (এমএমএস) দেওয়া হবে।
গত ২১ জুন অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৬৩৬ কোটি ২১ লাখ ২০ হাজার টাকা। পরবর্তীতে এর ব্যয় ৪০২ কোটি ৮৫ লাখ ৩৩ হাজার টাকা বৃদ্ধি পায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ছয় মাস বৃদ্ধি পাওয়া, জাতীয় এইডস ও এসটিডি কর্মসূচি ২৩ জেলা থেকে বাড়িয়ে ৬৪ জেলায় সম্প্রসারণ করা, যক্ষ্মা কর্মসূচির জন্য দুটি নতুন ভ্যান সংযোজন এবং রোগীদের জন্য পুষ্টি সহায়তা যুক্ত করাই এ ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
তবে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় বাড়লেও গ্লোবাল ফান্ডের অনুদানের পরিমাণ কমেছে। পিইসি পর্যালোচনায় প্রকল্প সাহায্য ধরা হয়েছিল ১ হাজার ১৪১ কোটি ৪৯ লাখ ১৪ হাজার টাকা। তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৭০ কোটি ১৭ লাখ ৮৩ হাজার টাকায়–অর্থাৎ বৈদেশিক সহায়তা কমেছে ২৭১ কোটি ৩১ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন বেড়েছে ৬৭৪ কোটি ১৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
প্রকল্পটি দেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলা ও ৪৯৫টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হবে। এর অধীনে মোট ১ হাজার ৩৮টি সেবাকেন্দ্রকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৪৯৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৪০টি জেলা হাসপাতাল, ৩৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ৪৪টি বক্ষব্যাধি ক্লিনিক, আইসিডিডিআর,বি-র ১১টি কেন্দ্র, ব্র্যাকের ৬৩টি কেন্দ্র এবং ৩ ৪৮টি পেরিফেরাল ল্যাবরেটরি অন্তভুর্ক্ত।
এইচআইভি পরীক্ষা সেবাও ২০টি অগ্রাধিকার জেলা থেকে বাড়িয়ে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জন এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন, যার ১৭ শতাংশই (৩৩৪ জন) ছিলেন পূর্বের অগ্রাধিকার দেওয়া জেলাগুলোর বাইরের বাসিন্দা। ফলে এই সেবা জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
একই বছর ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত মোট রোগীর প্রায় ৯০ শতাংশই পাওয়া গেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায়—যার মধ্যে বান্দরবানে ৪৯ শতাংশ এবং রাঙ্গামাটিতে ৩৬ শতাংশ। এ কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার রাখার পাশাপাশি ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো ম্যালেরিয়া নির্মূলের জন্য নির্ধারিত জেলাগুলোতেও বিশেষ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও এইডসের চিকিৎসাসেবা আলাদাভাবে পরিচালনা না করে সমন্বিত উপায়ে বাস্তবায়ন করলে বিপুল অর্থ সাশ্রয় সম্ভব। একই সঙ্গে বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় অর্থায়ন বৃদ্ধি, আক্রান্তদের প্রতি সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য দূরীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, এনজিও, গণমাধ্যম ও স্থানীয় জনসাধারণকে একযোগে সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দিয়েছে কমিশন।


