পদ্মা জেনারেলে শিশুমৃত্যু: অবহেলার প্রমাণ পায়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

পদ্মা জেনারেলে শিশুমৃত্যু: অবহেলার প্রমাণ পায়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

ঢাকার কাঁঠালবাগানের পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে নয় মাস বয়সী শিশু আয়ান আবদুল্লাহর মৃত্যুর ঘটনায় প্রাথমিক পরিদর্শনে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কোনো প্রমাণ পায়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস)।

তবে শিশুটির মৃত্যু, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা, অবকাঠামো, অতিরিক্ত ফি আদায় এবং চিকিৎসক রেফারসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

সোমবার সকাল ১০টার দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি দল হাসপাতালটি পরিদর্শন করে। প্রায় এক ঘণ্টা হাসপাতালের ব্যবস্থাপক ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলার পর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) মো. জাহিদ রায়হান।

তিনি বলেন, ‘শিশুটির শারীরিক জটিলতা ছিল, বেশ কয়েকটি রোগে ভুগছিল। শেষের দিকে খাদ্যনালিতে খাবার আটকে যাওয়া এবং সেপটিসেমিয়ায় ভুগছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা হাসপাতালের কোনো অবহেলা খুঁজে পাইনি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত ১ সেপ্টেম্বর আয়ানকে পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার জন্মগত কিছু ত্রুটির পাশাপাশি খাদ্যনালিতে খাবার আটকে যাওয়া এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতা ছিল। রোববার রাতে পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরে তার মৃত্যু হয়।

হাসপাতালের মেডিকেল অফিসা নাজমুল হক বলেন, শিশুটির হঠাৎ হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে তার শ্বাস-প্রশ্বাসও বন্ধ হয়ে যায়। তার দাবি, রাত ৮টা পর্যন্ত শিশুটি ভালো ছিল। রাত ৯টার দিকে তার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলেও জানান তিনি।

শিশুটির মৃত্যুর পর তার স্বজন আসিফ হাসান ফেসবুকে লাইভে এসে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করেন। রোববার রাত ১টার দিকে করা ওই লাইভ পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

আসিফের অভিযোগ, পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে দেখতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের যেতে দেয়নি। পরে তারা পিআইসিইউতে গিয়ে শিশুটিকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। চিকিৎসকদের ডাকলেও কেউ আসেননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুই লাখ টাকার বেশি বিল নিয়েছে বলেও দাবি করেন আসিফ।

আরও পড়ুন

তবে চিকিৎসকের অনুপস্থিতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম অনিক বলেন, ‘চিকিৎসক ছিল কি ছিল না, এটা সিসি ক্যামেরা দেখলেই জানা যাবে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। ২৪ ঘণ্টা আমাদের ওখানে চিকিৎসক, নার্স সবাই আছে।’

হাসপাতালের ব্যবস্থাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ডাক্তার সেই সময় ছিল। কিন্তু লাইভের সময় সেই ব্যক্তি প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়, তাই ডাক্তাররা প্রাণ বাঁচাতে একটি কক্ষে নিরাপদে আশ্রয় নেন।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দলও চিকিৎসকের অনুপস্থিতির অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি। জাহিদ রায়হান বলেন, ঘটনার সময় পরামর্শক নাজমুল হকসহ দুজন চিকিৎসক হাসপাতালে ছিলেন। হট্টগোলের পর নিরাপত্তার কারণে চিকিৎসকরা অন্য একটি কক্ষে চলে যান বলেও জানান তিনি।

এদিকে, ঘটনার সময় শিশুটির স্বজনেরা হাসপাতালে ভাঙচুর ও কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, স্বজনেরা মূল্যবান ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট করেছেন এবং কয়েকজন নার্সকে মারধর করেছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে পারেনি। স্বজনেরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পিআইসিইউতে ভাঙচুরের ঘটনাকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ উল্লেখ করে জাহিদ রায়হান বলেন, ‘পিআইসিইউ কক্ষে ভাঙচুর করে ফৌজদারি অপরাধ করেছে তারা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চাইলে এ বিষয়ে আইনগত সহযোগিতা নিতে পারে।’

শিশুটির মৃত্যুর পর স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালের কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রশাসনের সহযোগিতায় শিশুটির মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শিশুটির মা ময়নাতদন্তে আপত্তি জানিয়ে বলেন, এতে শিশুটির মরদেহ কাটাছেঁড়া করতে হবে। পরে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিকে, পদ্মা জেনারেল হাসপাতালের পিআইসিইউতে ভর্তি আরেক শিশুর নাম এক স্বজন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, তারা নোয়াখালী থেকে সাত দিন বয়সী শিশুটিকে নিয়ে সেখানে এসেছেন।

তিনি বলেন, শিশুটিকে ভর্তি করাতে কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চেষ্টা করেও কোনো পিআইসিইউ শয্যা পাননি। আয়ানের মৃত্যুর পর শিশুটিকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার কথা ভাবলেও কোথাও খালি শয্যা না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। সংকটাপন্ন শিশুটিকে স্থানান্তর করা নিয়েও পরিবারের উদ্বেগ ছিল।

তিনি জানান, শিশুটির শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পদ্মা জেনারেল হাসপাতাল ও অন্যান্য হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সেখানেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

আরও কয়েকজন রোগীর স্বজন জানান, সরকারি শিশু হাসপাতালে পিআইসিইউ শয্যা না পেয়ে তারা পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে এসেছেন। তাদের কেউ অ্যাম্বুলেন্সচালকের মাধ্যমে, আবার কেউ শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শে সেখানে এসেছেন বলে জানান।

চিকিৎসক রেফার ও দালালদের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহিদ রায়হান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা লজ্জিত। তবে অনেক সময় হাসপাতালে সিট ভর্তি থাকার কারণে রোগী নেওয়ার মতো অবস্থাও থাকে না। তবে তদন্তে এই বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।’

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করছি। যার মধ্যে শিশুর মৃত্যুসহ হাসপাতালের অবকাঠামো, অতিরিক্ত ফি আদায়সহ সবকিছু দেখা হবে। তদন্তের পর রিপোর্ট অনুসারে যে ধরনের গাফিলতি পাওয়া যাবে, সেই অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর