আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের কয়েকটি মামলার রায় ঘোষণা হলেও অভিযুক্তদের বড় একটি অংশকে এখনো আইনের আওতায় আনা যায়নি।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় সাতটি মামলায় এ পর্যন্ত ৬৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে একটি বড় অংশই পলাতক, যাদের অনেকেরই কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তারা সবাই পলাতক।
প্রসিকিউশনের তথ্যমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুম, খুন ও নির্যাতন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় মোট ৬৫টি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন বা তদন্তাধীন আছে। এসব মামলায় মোট আসামি ৪৫৮ জন। তাদের মধ্যে ১৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ২৮৮ জন এখনো পলাতক।
তবে আসামিদের কেউ কেউ একাধিক মামলার আসামি হওয়ায় এই তালিকায় তাদের নাম একাধিকবার গণনা করা হয়েছে। ফলে ব্যক্তি হিসেবে পলাতকের প্রকৃত সংখ্যা কিছুটা কম হতে পারে।
ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারাধীন ১৫টি মামলায় ৪৪ জন গ্রেপ্তার এবং ১১৯ জন পলাতক রয়েছেন। আর তদন্তাধীন ৩১টি মামলায় ৮৩ জন গ্রেপ্তার হলেও পলাতক ৮৭ জন। এর মধ্যে তদন্ত চলাকালে গ্রেপ্তার থাকা একজন আসামি আত্মহত্যা করেছেন।
ট্রাইব্যুনাল-২-এ বিচারাধীন পাঁচটি মামলায় ৮ জন গ্রেপ্তার ও ৪০ জন পলাতক আছেন। তদন্তাধীন আটটি মামলায় গ্রেপ্তার ১৪ জন এবং জামিনে আছেন একজন।
দুই ট্রাইব্যুনাল থেকে এ পর্যন্ত যে ছয়টি মামলার রায় হয়েছে, সেগুলোতে ১৯ জন আসামি গ্রেপ্তার থাকলেও পলাতক রয়েছেন ৪২ জন। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, এসব মামলায় ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে—যাদের মধ্যে ১৮ জনই পলাতক এবং মাত্র চারজন গ্রেপ্তার আছেন।
এ ছাড়া আরও ৪৫ জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেওয়া হয়েছে।
পলাতকদের তালিকায় রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেন এবং সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।
এ ছাড়াও পলাতকদের তালিকায় রয়েছেন বেশ কয়েকজন সাবেক সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর একাধিক নেতাকর্মী।
গুমের দুই মামলায় মোট ৩০ জন আসামির মধ্যে ১৭ জনই পলাতক। বেশ কয়েকটি মামলার কাজ এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, যেখানে আসামিদের অনুপস্থিতি বিচার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কুষ্টিয়ার একটি হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ চার আসামির রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। এই মামলারও সব আসামি পলাতক।
একইভাবে নারায়ণগঞ্জের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
মামলার বিচার ও আসামিদের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিচার চলাকালে আসামিদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার ওপরও থাকে। তদন্তের সময় প্রসিকিউশনও অনেককে গ্রেপ্তার করে। তবে রায় হয়ে যাওয়ার পর আসামিদের ধরা ও সাজা কার্যকরের মূল দায়িত্ব পড়ে সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর।’
প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম জানান, রায় হওয়ার পরও আসামিরা ধরা না পড়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মনে যেমন হতাশা তৈরি হচ্ছে, তেমনি বিচারের মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের কাজ। আসামিদের ধরতে না পারার পুরো দায় কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপানো ঠিক নয়। কারণ, অনেক আসামি একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে গোপনে দেশ ছেড়েছেন।’
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি (মিডিয়া) শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে তাদের চেষ্টা থেমে নেই। তিনি বলেন, ‘পলাতক আসামিদের অবস্থান সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া গেলেই তাদের গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হবে।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। পরে তাদের কেউ কেউ সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ওবায়দুল কাদের বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
এ ছাড়া অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন যুক্তরাজ্যে এবং কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম ও দুবাইয়ে রয়েছেন বলে জানা গেছে।


