বাংলাদেশে বাজারে বিক্রি হওয়া অনেক প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কে যেসব পুষ্টির তথ্য দেওয়া থাকে, তা আসলে সত্যি নয়। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় পণ্যের গায়ে ঘোষিত লবণ, ফ্যাট ও ট্রান্স-ফ্যাটের মাত্রা আর প্রকৃত মাত্রার মধ্যে ব্যাপক তফাত পাওয়া গেছে।
গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন গবেষকের করা চারটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত প্রক্রিয়াজাত খাবার, তৈরি খাবার ও ভোজ্যতেলে মোড়কে লেখা পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় এসব উপাদান রয়েছে। এসব উপাদানের বেশি মাত্রা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা প্যাকেটজাত খাবারের ৬৭ শতাংশ পণ্যে লবণের পরিমাণ কম দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া ৫৮ শতাংশ পণ্যে ট্রান্স-ফ্যাট এবং ৫৪ শতাংশ পণ্যে মোট ফ্যাটের আসল পরিমাণ লুকিয়ে কম করে দেখানো হয়েছে।
অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত খাবারে ল্যাবরেটরিতে পাওয়া লবণের চেয়ে প্যাকেটের গায়ে লবণের মাত্রা কম লেখা ছিল। এমনকি ৯ শতাংশ খাবারের মোড়কে লবণের কোনো তথ্যই ছিল না।
এমন এক সময়ে এই গবেষণার তথ্যগুলো সামনে এলো, যখন বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটে নানা ধরনের অসংক্রামক ব্যাধিতে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ মানুষেরই অকাল মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশিরা প্রতিদিন গড়ে ৬ দশমিক ৭ থেকে ৯ গ্রাম পর্যন্ত লবণ খান, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ ৫ গ্রামের সীমার চেয়ে অনেক বেশি। দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি ৩৯ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছেন এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে।
‘গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ ২০২১’-এর হিসাব অনুযায়ী, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ট্রান্স-ফ্যাট খাওয়া এবং মিষ্টি পানীয়সহ অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার মানুষ মারা যান।
‘ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রথম গবেষণার শিরোনাম ছিল: ‘বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটজাত খাবার অস্বাস্থ্যকর এবং এগুলোর পুষ্টি উপাদান মোড়কের ঘোষণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়’। এই গবেষণার জন্য বিভিন্ন প্রকার জনপ্রিয় প্যাকেটজাত খাবারের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
এই খাবারগুলোর মধ্যে ছিল চিপস, চানাচুর, ভাজা ডাল, নুডুলস, বিস্কুট, চকোলেট, আইসক্রিম, চাটনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার।
ল্যাবের পরীক্ষায় দেখা যায়, অনেক কোম্পানিই খাদ্যের মৌলিক পুষ্টির সঠিক তথ্য দেয়নি। প্রায় অর্ধেক পণ্যে ক্ষতিকর ‘স্যাচুরেটেড ফ্যাট’-এর তথ্য গোপন রাখা হয়েছে এবং ৩৮ শতাংশ পণ্যে খাদ্য-আঁশ বা ট্রান্স-ফ্যাট সংক্রান্ত তথ্যই দেওয়া হয়নি।
২১ শতাংশ খাবারের প্যাকেটে চিনি ও লবণের কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি এবং ১৭ শতাংশ খাবারে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট বা শক্তির মান সঠিকভাবে লেখা ছিল না।
গবেষকদের বিচার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি খাবারও এক সঙ্গে লবণ, চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ট্রান্স-ফ্যাটের সঠিক তথ্য মোড়কে তুলে ধরতে পারেনি।
মাত্র ৪ শতাংশ পণ্যে মোট ফ্যাটের পরিমাণ এবং ৮ শতাংশ পণ্যে খাদ্য-আঁশের সঠিক তথ্য পাওয়া গেছে।
এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ছাড় দেওয়া সহজ নিয়ম প্রয়োগ করেও দেখা গেছে, লবণের তথ্যের ক্ষেত্রে মাত্র ৩৮ শতাংশ, স্যাচুরেটেড ফ্যাটের ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ এবং চিনির ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ পণ্যের দাবি ল্যাবের পরীক্ষার সঙ্গে মিলেছে।
তাই গবেষকরা বলছেন, প্যাকেটজাত খাবারের লেবেল নিয়মিত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা দরকার এবং ভোক্তাদের সতর্ক করতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
লবণে ভরা খাবার
এমডিপিআই সাময়িকীতে প্রকাশিত দ্বিতীয় গবেষণায় বলা হয়, ১৪টি ক্যাটাগরির ১০৫টি প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার পরীক্ষা করে দেখা গেছে সুপে সবচেয়ে বেশি লবণ থাকে—প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৩ হাজার ১৫০ মিলিগ্রাম। এরপরেই রয়েছে ইনস্ট্যান্ট নুডুলস (১ হাজার ৫১৬ মিলিগ্রাম), আচার ও চাটনি (১ হাজার ৩৭৯ মিলিগ্রাম) এবং চানাচুর (৮৫২ মিলিগ্রাম)।
গবেষকরা সতর্ক করেন বলেন, অতিরিক্ত লবণের খাবার খাওয়া কমাতে খাবারে লবণের সীমা বেঁধে দেওয়া, খাবারের রেসিপি বদলানো এবং বাজার মনিটরিং বাড়ানো দরকার।
এই গবেষণায় ৯৭৪ জন শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের খাওয়ার অভ্যাস পরীক্ষা করা হয়। দেখা গেছে, ৯৭ শতাংশ মানুষই আগের সপ্তাহে অন্তত একটি প্রক্রিয়াজাত খাবার খেয়েছেন।
শিশুরা এসব খাবার সবচেয়ে বেশি খায়—সপ্তাহে গড়ে ২১ বার। কিশোর-কিশোরীরা খায় সপ্তাহে ১৬ বার এবং প্রাপ্তবয়স্করা ১১ বার।
গ্রামের তুলনায় শহর এলাকার মানুষ এগুলো বেশি খায়। শহরে সপ্তাহে গড়ে ১৭ বার এসব খাবার খাওয়া হয়, যা গ্রামে গড়ে ১১ বার।
প্যাকেটজাত খাবারের মধ্যে মিষ্টি বিস্কুট সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয়, এরপরই রয়েছে চানাচুর ও ইনস্ট্যান্ট নুডুলস।
ঘরে ঘরে প্রক্রিয়াজাত খাবার
‘বায়ো রিসার্চ কমিউনিকেশনস’-এ প্রকাশিত অন্য একটি গবেষণায় দেশের আটটি বিভাগের ৪৮০টি পরিবারে জরিপ চালানো হয়।
সেখানে দেখা যায়, তৈরি খাবার বাংলাদেশে নিত্যদিনের খাবারের অংশ হয়ে গেছে। মুড়ি, পেঁয়াজু, চানাচুর, চিপস, খোলা আইসক্রিম, জিলাপি, চকোলেট ও কেক এখন প্রায় সব পরিবারেই খাওয়া হয়।
খাবারের সহজলভ্যতা, কম দাম এবং সব জায়গায় পাওয়ার কারণে মানুষ এখন বাণিজ্যিক প্রস্তুত করা খাবারের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
রান্নার তেলেও লুকিয়ে আছে ট্রান্স-ফ্যাট
এই স্বাস্থ্যঝুঁকি কেবল স্ন্যাক্স বা প্যাকেটের খাবারের মধ্যেই আটকে নেই। ‘ফুড কেমিস্ট্রি অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় আটটি বিভাগ থেকে সংগ্রহ করা ১০৬টি সয়াবিন ও পাম তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
দেখা গেছে, প্যাকেটজাত ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেলের ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং খোলা সয়াবিন তেলের ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ২ শতাংশের সীমার চেয়ে বেশি ট্রান্স-ফ্যাট রয়েছে। তবে পাম তেলের কোনো নমুনায় এই সীমা পার হয়নি।
গবেষকদের হিসাবে, কেউ যদি দিনে ২৭ গ্রাম ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল ব্যবহার করেন, তবে তিনি দিনে শূন্য দশমিক ৭৫ গ্রাম ট্রান্স-ফ্যাট খেয়ে ফেলছেন। এটি তেল শোধন ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্ন তোলে।
বাংলাদেশে ব্যবহৃত ভোজ্যতেলের মূল কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনা হয় এবং পরে দেশে শোধন করা হয়।
শিল্পের দৌড়ে পিছিয়ে তদারকি
বাংলাদেশে যখন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজার খুব দ্রুত বড় হচ্ছে, তখনই এসব তথ্য সামনে এল। গবেষণায় দেখা গেছে, এই খাদ্য শিল্প প্রতি বছর ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে এবং এর বর্তমান বাজারের আকার প্রায় ২২০ কোটি মার্কিন ডলার।
মানুষের আয় বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে এই ধরনের খাবারের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় তদারকি ও নজরদারি বাড়েনি। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এখন মোড়কের নিয়ম কঠোর করার কাজ করছে।
সংস্থার সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব জানান, তারা খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে এটি আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে। আইন মন্ত্রণালয় পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর সেটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়ে সরকারি গেজেট হিসেবে প্রকাশ হবে।
গেজেট প্রকাশের পর খাদ্য প্রস্তুতকারকদের এই নিয়ম মানতে ১ বছর সময় দেওয়া হবে। এরপর থেকে অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ফ্যাটযুক্ত খাবার যেন মানুষ দেখলেই চিনে নিতে পারে এবং ভালো খাবার বেছে নিতে পারে।
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষক আবু আহমেদ শামীম বলেন, সহজে পাওয়া যায় বলেই এসব খাবার এড়িয়ে চলা কঠিন হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, প্যাকেটের ঠিক সামনের দিকে বড় করে সতর্কতামূলক লেখা বা চিহ্ন দিলে মানুষ দেখেই খাবারটি চিনতে পারবে। কারণ, সাধারণ মানুষের পক্ষে প্যাকেটের পেছনের ছোট ছোট জটিল পুষ্টির তথ্য পড়ার সময় বা সুযোগ থাকে না।
সব মিলিয়ে চারটি গবেষণাই একটি মূল সমস্যার কথা বলছে—সুরক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে বাজার অনেক দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাই নিয়মিত ল্যাবে পরীক্ষা, তেলের শোধন তদারকি এবং প্যাকেটে স্পষ্ট সতর্কতামূলক চিহ্ন দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন গবেষকরা।
গবেষণা সংস্থা ‘প্রজ্ঞা’-র নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, মোড়কে সঠিক তথ্য দেওয়া এখন কেবল ব্যবসার বিষয় নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার বিষয়।
তাই প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক চিহ্ন থাকলে তা অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখবে। তিনি সরকারকে দেরি না করে দ্রুত এই নিয়ম চালুর অনুরোধ জানান।


