মহাস্থানগড় ‘ভূতুড়ে আপিল’ ঘিরে আইনি ঝড়

মহাস্থানগড় ‘ভূতুড়ে আপিল’ ঘিরে আইনি ঝড়
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

বগুড়ার প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান মহাস্থানগড় সংরক্ষণে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ চ্যালেঞ্জ করে লিভ-টু-আপিল দায়ের নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম ধোঁয়াশা। আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটির কার্যালয়ে চিঠি দিয়ে এমন আপিল দায়েরের কথা অস্বীকার করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

প্রকৃতপক্ষে কে এই আবেদনটি করেছেন–তা নিয়ে একাধিক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে আসার পর ঘটনা আরও ঘনীভূত হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের এক আইনজীবী দাবি করেন, আপিলটি এসেছে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত আইন মন্ত্রণালয়ের অনুবিভাগ সলিসিটর কার্যালয় থেকে।

তবে এই মামলার অ্যাডভোকেট-অন-রেকর্ড জোর দিয়ে বলছেন, আবেদনটি সরাসরি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকেই এসেছে।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যের বেঞ্চ রোববার মামলাটির সংক্ষিপ্ত শুনানি গ্রহণ করে। মঙ্গলবারও এই শুনানির কথা থাকলেও রহস্যজনকভাবে সেদিনের কার্যতালিকা থেকে মামলাটি বাদ পড়ে।

এক নজিরবিহীন নাটকের পর এই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। মূলত ২০১২ সালের জানুয়ারিতে দেওয়া হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনার বিষয় স্মরণ করিয়ে দিয়ে সলিসিটর কার্যালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

ওই নির্দেশনায় সুরক্ষিত এই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ ও এর আশপাশের এলাকায় যেকোনো নতুন নির্মাণ, খনন, ভেঙে ফেলা বা সম্প্রসারণ কাজের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘সিভিল পিটিশন ২২৩৪/২০২৬’-এর মাধ্যমে আদালতের সেই সংরক্ষণ আদেশ স্থগিত করার আবেদন জানানো হয়েছে, যেখানে প্রধান আবেদনকারী হিসেবে সংস্কৃতি সচিবের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই আবেদনের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, সংশ্লিষ্ট সচিবের সঙ্গে এই মামলার কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই এবং তিনি কখনোই এই আপিল দায়েরের অনুমোদন দেননি।

রহস্যময় এই ‘ভূতুড়ে পিটিশনে’ ছয়জন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার নাম আবেদনকারী হিসেবে রয়েছে: সংস্কৃতি বিষয়ক সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, বগুড়ার জেলা প্রশাসক, বগুড়ার পুলিশ সুপার, শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং মহাস্থানগড় জাদুঘরের কাস্টডিয়ান।

কৌতূহলজনক বিষয় হলো, আদালতের নিষেধাজ্ঞা প্রকাশ্যে অমান্য করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম মহাস্থানগড় এলাকায় নতুন খনন ও নির্মাণকাজের উদ্বোধন করার পরপরই এই আপিল পিটিশনটি সামনে আসে। ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে পিটিশনে নাম থাকা প্রত্যেক কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষই আপিল দায়ের করার কথা অস্বীকার করেছে।

অফিসিয়াল সূত্রগুলো একে অপরের ওপর দায় চাপানোয় এই আইনি নথিপত্রের প্রকৃত উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অ্যাডভোকেট-অন-রেকর্ড হরিদাস পাল সরাসরি আঙুল তুলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের দিকে। তার দাবি, সেখান থেকেই আবেদনটির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তবে সলিসিটর ছানা মো. মারুফ হোসেন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অন্যদিকে, অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বর্তমানে বিদেশে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তবে রোববার শুনানিতে অংশ নেওয়া অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক উল্টো সলিসিটর কার্যালয়ের ওপর দায় চাপিয়েছেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, সলিসিটর বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়েছিল বলেই তারা আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

এসব পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মুখে পরবর্তীতে অনীক আর হক আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি কেবল যোগ করেন, একজন বিচারকের অসুস্থতার কারণে মঙ্গলবারের শুনানি স্থগিত রাখা হয়েছে। পরবর্তী শুনানিতে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাবে।

প্রসঙ্গত, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম মহাস্থানগড়ে নির্মাণকাজের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আধা-সরকারি চিঠি দিয়েছিলেন। এরপরই নির্মাণকাজের আইনি বাধা অপসারণে এই ‘ভুতুড়ে’ আপিলের উদ্ভব হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad