মে মাসেও অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস, বিপাকে কৃষক

মে মাসেও অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস, বিপাকে কৃষক
জলাবদ্ধতা দূর করতে হাওরের বাঁধ কাটছে মানুষ। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশে এবার বর্ষা এত দ্রুত আসার কথা ছিল না। কিন্তু এপ্রিলের পর মে মাসের শুরুতেও বৃষ্টির সেই একই তীব্রতা অব্যাহত থাকায় চরম মূল্য দিতে হচ্ছে দেশের ধানখেতগুলোকে। আবহাওয়ার এই অস্বাভাবিক আচরণ এখন একটি বড় ধরনের কৃষি সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে বোরো ধান কাটার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অতিবৃষ্টি কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।

হাওরাঞ্চলের যে বিস্তীর্ণ মাঠ কয়েকদিন আগেও সোনালি ফসলের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল ছিল, তা এখন পানির নিচে। সমতলের পাকা বোরো ধানও বৃষ্টির কারণে নুয়ে পড়ছে। লাখ লাখ কৃষক যারা এই মৌসুমে তাদের সর্বস্ব বিনিয়োগ করেছেন, তাদের কাছে এখন লাভ-লোকসান নয়, বরং টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আবহাওয়া দপ্তরের উদ্বেগজনক তথ্য

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বিচ্যুতি। পূর্বাভাস বলছে, মে মাসও একই পথ অনুসরণ করছে। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর জন্য ইতোমধ্যে ‘ভারী থেকে অতি ভারী’ বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।

জেষ্ঠ্য আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক সতর্ক করে বলেছেন, স্বল্পমেয়াদী আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে আগামী দিনগুলোতে উত্তরাঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে।

কৃষি অর্থনীতিতে আঘাত

একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই বৃষ্টির সময়টা এর চেয়ে খারাপ হতে পারত না। দেশের অধিকাংশ বোরো ধান এখন পেকে গেছে এবং যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান কাটা চলছে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখনকার বৃষ্টি শুধু ধান কাটাই দেরি করাচ্ছে না, বরং ধান গাছ মাটিতে শুইয়ে দিচ্ছে এবং কাটা শস্য নষ্ট করে কৃষকের কয়েক মাসের পরিশ্রম পণ্ড করে দিচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত হাওরাঞ্চল

অতিবৃষ্টির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওর অববাহিকায়।

সুনামগঞ্জে সরকারি হিসেবে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ১১০ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন

এ ছাড়া কিশোরগঞ্জে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, হবিগঞ্জে ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং নেত্রকোনা ও নাসিরনগরে প্রায় ৩৮৬ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে হাওরাঞ্চলের প্রায় ১১ শতাংশ বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ১ শতাংশ।

কৃষকদের আর্তনাদ

পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো কৃষকের হাহাকার। বানিয়াচং উপজেলার সুনারু গ্রামের বর্গা চাষি মহাদেব দাস ১৯ বিঘা জমিতে ধান চাষের জন্য আড়াই লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। তিনি মাত্র ২ বিঘা ধান কাটতে পেরেছেন।

‘যা কেটেছি তাও রোদের অভাবে উঠানে পচে যাচ্ছে। এখন ঋণের টাকা শোধ করবো কীভাবে?’ বিষণ্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন তোলেন মহাদেব দাস।

একই উদ্বেগ শিবপাশার সেন্টু মিয়া, সুলতানশীর আকবর মিয়া এবং আতুকুরার জসিম উদ্দিনের। নীলফামারীর মতো উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতেও এখন ধান নষ্ট হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

জাতীয় প্রভাব ও খাদ্য নিরাপত্তা

চলতি বছর রেকর্ড ৫০ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। তবে অকাল বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ (১০ থেকে ১২ লাখ টন) ঘাটতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জাহাঙ্গীর আলম।

তিনি বলেন, ‘এটি কেবল কৃষকের সমস্যা নয়। ফলন কমলে এবং উৎপাদন খরচ বাড়লে তা বাজারে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঘটাতে পারে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে চাল আমদানির কথা ভাবতে হতে পারে।’

এ ছাড়া তিনি গত বছরের নির্ধারিত সংগ্রহ মূল্য পুনর্মূল্যায়ন করে কৃষকদের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই তীব্রতায় শুধু সাময়িক সমাধান যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদি কৃষি পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad