বিদেশে গিয়ে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ফিরে এলে, কিংবা বহু বছর পর–উড়োজাহাজ থেকে ঢাকার মাটি চোখে পড়ার মুহূর্তটি অনেকের কাছেই এক ধরনের নীরব আবেগ তৈরি করে। পরিচিত শহর, নদী আর জনপদের ওপর দিয়ে তাকালে বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত টান অনুভূত হয়। এই অনুভূতি ব্যক্তিগত হলেও তা প্রায় সবার মধ্যেই কমবেশি কাজ করে।
প্রায় ১৭ বছর পর তারেক রহমানের ফিরে আসার দিনটিও ছিল তেমনই। ঢাকার আকাশ সেদিন কুয়াশায় ঢাকা ছিল, অনেকটা লন্ডনের মতো। ভাষণে তিনি বলেননি, দীর্ঘ সময় পর দেশের মাটি প্রথম দেখার মুহূর্তে তার অনুভূতি কী ছিল। কিন্তু কিছু অনুভূতি শব্দে না বললেও প্রকাশ পায় আচরণে।

জুতা-মোজা খুলে ঘাসে পা রাখা, মাটিতে হাত ছোঁয়ানো–এই নীরব মুহূর্তটি রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়েও বেশি কিছু বোঝায়। এটি ছিল জন্মভূমির সঙ্গে এক ধরনের পুনঃসংযোগের প্রতীক।
সেদিনের দৃশ্যগুলোর মধ্যে এই মুহূর্তটি অনেকের চোখে সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে উঠেছে। রাজনীতিতে প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন কোনো নেতা দীর্ঘ নির্বাসনের পর দেশে ফেরেন। এই প্রতীকী আচরণ আবেগ তৈরি করে, আবার প্রত্যাশাও বাড়ায়।

ভাষণে তারেক রহমান যে কথাটি স্পষ্টভাবে বলেছেন, তা হলো–সকল ধর্ম, সকল শ্রেণি, সকল বয়স ও সকল লিঙ্গের মানুষের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা। বক্তব্যটি পরিচিত শোনালেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ, নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তি শুধু নীতিগত অবস্থান নয় এটি বাস্তবায়নের প্রশ্নও সামনে আসে।
২৫ ডিসেম্বর তাই শুধু একটি প্রত্যাবর্তনের দিন নয়, রাজনৈতিক অর্থেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ সময়। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর দেশে ফিরে আসা একজন নেতার কাছ থেকে সমর্থকরা যেমন আবেগের প্রকাশ দেখেন, তেমনি সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করেন দিকনির্দেশনা।
তারেক রহমান আশার কথা বলেছেন, একটি পরিকল্পনার কথা বলেছেন–কিন্তু সেই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেননি।
এখানেই বিশ্লেষণের জায়গা তৈরি হয়েছে। রাজনীতিতে ‘আমাদের একটি পরিকল্পনা আছে’–এই বাক্যটি নিজেই একটি প্রতিশ্রুতি। কিন্তু আধুনিক রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি থাকলেই পাশাপাশি আসে কিছু স্বাভাবিক প্রশ্ন। পরিকল্পনাটি কী, তা বাস্তবায়নে কত সময় লাগবে, ব্যয় কত হবে, সেই অর্থের উৎস কোথায়, কত মানুষ এতে উপকৃত হবে–এসব প্রশ্ন এখন জনপরিসরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পশ্চিমা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো নেতা যখন রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনার কথা বলেন, তখন প্রথমেই যে প্রশ্নটি ওঠে তা হলো–পরিকল্পনাটি অর্থায়নসহ পূর্ণাঙ্গ কি না। তারেক রহমান দীর্ঘদিন লন্ডনে ছিলেন। ফলে তার রাজনৈতিক ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই সংস্কৃতির প্রভাব থাকার প্রত্যাশা তৈরি হয়। তাই ‘উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ বলার পর জনমনে নির্দিষ্টতার দাবি ওঠা স্বাভাবিক।

তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে–এমন ধারণা অনেকের। এখন দেখার বিষয়, সেই অধ্যায় কেবল আবেগ ও প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সুস্পষ্ট সময়সূচি, ব্যয় ও বাস্তবায়ন কাঠামোসহ একটি বাস্তব পরিকল্পনায় রূপ নেয়।
রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন একটি মুহূর্ত, কিন্তু পরিকল্পনার বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘ পথচলা। এই পথচলায় কীভাবে তিনি এগোবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।


