জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের আর্থিক খাতের টালমাটাল অবস্থা সামাল ও সংস্কারের মাধ্যমে স্থিতিশীল রূপ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পান অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। টাইমস অব বাংলাদেশকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ার কথা। বলেছেন, ক্রিপ্টো কারেন্সি অনুমোদনের ইচ্ছার কথা; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্বশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আপ্রাণ চেষ্টার কথাও।
সব মিলিয়ে আর্থিক খাতের বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন টাইমস অব বাংলাদেশের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের-এর সঙ্গে।
টাইমস: এক সংকটময় মুহূর্তে আপনাকে আর্থিক খাত সুস্থ করার দায়িত্ব নিতে হয়েছে। এই কাজ করতে গিয়ে আপনাকে কী ধরনের চাপ সামলাতে হচ্ছে?
আহসান এইচ মনসুর: আমাদের কাছে এমন কোনো সিলভার বুলেট নেই যেটা আমি ফায়ার করলাম আর সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। প্রথমে আমরা ডলারের দামটা স্থিতিশীল করলাম। দ্বিতীয় ধাপে আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাউন্টার গ্যারান্টিদাতা ২০০’র বেশি বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল মিটিং করলাম। তাদেরকে বললাম, তোমরা আমাদের দরজাটা বন্ধ করো না। আমরা তোমাদের পাওনা শোধ করে দেব।
এদিকে গত অক্টোবরে আইএমএফ বলল, তোমরা মুদ্রা বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করে দাও। আমি করিনি। যখন পরিস্থিতি অনুকূলে এল তখনই করেছি এবং দেখেছেন মুদ্রাবাজার একদম স্থিতিশীল। আমাদের লক্ষ্য, বিনিময় হার যেখানে আছে এর আশপাশেই থাকুক।
আমাদের মুদ্রা টাকাকে শক্তিশালী করার জন্য আমাদের মুদ্রানীতি আঁটসাঁট করেছি। আমাদের উদ্যোগের ফলে এখন ডলারের থেকে টাকা আকর্ষণীয়। টাকা এখন চাইলেই পাওয়া যায় না। টাকার দাম আছে। টাকার রিটার্ন অনেক বেশি এখন। মুনাফা করতে চাইলে এখন ডলার নয়, টাকা সংরক্ষণ করতে হবে। ডলারের রিটার্ন ৪ থেকে ৫ শতাংশ হলেও টাকার রিটার্ন ১০ থেকে ১১ শতাংশের ওপরে।
টাইমস: এটা তো দ্বিতীয় ধাপের কথা বললেন। তৃতীয় ধাপেতো আপনারা ব্যাংকগুলো পুনর্গঠনে মনোযোগ দিলেন।
আহসান এইচ মনসুর: এখন আমাকে ব্যাংক খাতের গভীর ক্ষত সারিয়ে মৌলভিত্তি ঠিক করতে হবে। এজন্য প্রথম ধাপে পাঁচটি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংককে একত্রিত করে বড় আকারের একটি সরকারি ইসলামী ব্যাংক গঠন করতে যাচ্ছি। অব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রথম সারির ৯-১০টা বাদ দিলে বাকিগুলো বিধ্বস্ত অবস্থায় যা উদ্ধারযোগ্য নয়। সেগুলোকে অবলোপনের দিকেই হয়তো নিয়ে যেতে হবে।
টাইমস: আপনি ব্যাপক প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থে হাত দিয়েছেন যাদের পেছনে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের আশির্বাদ থাকার কথা শোনা যায়। আপনাকে লক্ষ্যচ্যুত করতে অনেক লোভনীয় প্রস্তাব কিংবা চাপ আসার কথা। এরকম লোভনীয় প্রস্তাব কিংবা চাপ কেমন আসছে?
আহসান এইচ মনসুর: লোভনীয় প্রস্তাব কিংবা চাপ- যাই আসুক কিছু যায় আসে না। আলহামদুল্লিাহ! সরকার এবং রাজনীতিবিদের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এই আস্থার জায়গা সৃষ্টি হয়েছে যে, এই লোকটা যা বলে তার কিছুটা হলেও করে এবং কাজ করার উদ্দেশ্যেই হয়ত এসেছে। কাজ করে যাব, যদি কাজ করতে দেওয়া হয়। যদি কাজ করতে দেওয়া না হয়, থাকব না।
টাইমস: শোনা যাচ্ছে ব্যাংক লুটেরা ও পাচারকারীরা একটি রাজনৈতিক সরকারের অপেক্ষায় আছে যাদের আশির্বাদে তারা দায়মুক্তি পেয়ে যাবে এবং লুটের ধারা অব্যাহত রাখতে পারবে। দিনশেষে ফলাফল তাহলে কী হচ্ছে?
আহসান এইচ মনসুর: যারা দেশের ক্ষতি করেছে, সর্বনাশ করেছে, তাদের সঙ্গে কোনো সরকার অন্তত আগামী কয়েক বছরের মধ্যে হাত মেলাতে পারবে বলে আমি মনে করি না। জনগণ এটা করতে দেবে না। আওয়ামী লীগের শত্রু কে ছিল? তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংসের পথে নিয়ে গেছে। আগামী সরকারকেও এটা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। যারা অপেক্ষা করছে তারা অপেক্ষা করুক। আমরা আমাদের কাজ করে যাব।
টাইমস: আপনি যেভাবে চাচ্ছেন সব কাজ সেভাবে করতে পারছেন? বিএফআইইউ প্রধানের নিয়োগের প্রসঙ্গেই যদি আসি।
আহসান এইচ মনসুর: সত্য কথা বলতে গেলে, বিএফআইইউ প্রধানের নিয়োগের বিষয়ে গণমাধ্যমে যা আসছে সেটার সঙ্গে আমি একমত নই। এটা সত্য, প্রথম সারিতে বর্তমান প্রধানের নাম ছিল না। একটা কথা আছে না, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়। প্রথম সারির তিনজনই ওই ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে গেল। তারপরেও কী আমরা ভালো কিছু পেয়েছি? পাইনি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্যই বলব।
টাইমস: এখন যে চাল-ডিম-সবজির দাম বেড়ে যাচ্ছে, বাজারে কী কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে?
আহসান এইচ মনসুর: না। আমাদের মাঠকর্মীরা হয়ত উৎপাদনের তথ্য বাড়িয়ে বলে। এতে আমাদের নীতি নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমি সরকারকে বলব, এসব পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর না করে বাজারের তথ্যের ওপর নির্ভর করতে। যখনই দাম বেড়ে যাচ্ছে সাথে সাথে কেন আমি আমদানি করছি না? আমাদের শুল্কনীতিটা এমনভাবে করা উচিত যাতে আমার কৃষক আন্তর্জাতিক বাজারের থেকে ১০ থেকে ১২ শতাংশ বেশি দাম পায়। এর বেশি না। আমাদের ভোক্তাদের কথাওতো ভাবতে হবে। এখানে সরকারের নীতিগত শৈথিল্য বলি আর ব্যর্থতাই বলি, আরেকটু তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হলে ভালো হয়। চাল আমদানিতে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে কেন? আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে দুই মাস দেরি হলো কেন?
টাইমস: পাচারকারীদের সঙ্গে মীমাংসার মাধ্যমে পাচারের অর্থ ফেরত আনার কথা বলেছেন। এটা ন্যায় বিচারের পরিপন্থি হবে কিনা?
আহসান এইচ মনসুর: দেখুন, এখানে বাস্তববাদ ও আদর্শবাদের দ্বন্দ্ব। আমি মনে করি, ক্ষেত্রবিশেষে আমাকে বাস্তববাদী হতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, পাচারকারীকে আমরা ফাঁসির দড়িতে ঝোলাতে কোনদিনই হয়ত পারব না। তাহলে আদর্শবাদী না হয়ে যদি বাস্তববাদী হই, কেন তার কাছ থেকে আমি টাকা আদায় করব না? এটাই আমার অবস্থান।
আমরা ক্রিমিনালিটিতে যাব নাকি সিভিল স্যুটে যাব? এই দ্বন্দ হয়ত এই সরকার মেটাতে পারবে না। একদল বলবে যে, কী দরকার আছে এই সরকারের এটা করার? পরবর্তী সরকার করবে। আবার আরেকদল বলবে, কেন আমরা আপোষ করব? আমাদের বদনাম হয়ে যাবে।
এই বিতর্কের শেষ নেই। আমি যেটা বলব, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্নভাবে আমাদের এগোনো উচিত; বাস্তবসম্মতভাবে আমাদের এগোনো উচিত। ইউ মিনিমাইজ ইওর লস, নট ম্যাক্সিমাইজ মাই ফিলোসফি।
টাইমস: যেসব পাচারকারী মীমাংসার মাধ্যমে টাকা ফেরত দেবে তারা কী অপরাধ থেকে দায়মুক্তি পাবে?
আহসান এইচ মনসুর: এটা নির্ভর করবে দরকষাকষির ওপরে। অপরাধের মাত্রা ভয়ানক গুরুতর হলে নিষ্পত্তি বা মীমাংসার সুযোগই নেই। কিন্তু প্রাথমিক আর্থিক অপরাধ হলে আলোচনা হবে।
টাইমস: পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে অগ্রগতি কতদূর?
আহসান এইচ মনসুর: কিছু অগ্রগতি হয়েছে। আবার একটু স্লোডাউনও হয়েছে। আমরা লিগ্যাল প্যানেল করেছি। তারা সিদ্ধান্ত জানাক যে, মামলা কোনটি দেওয়ানিতে যাবে, কোনটি ফৌজদারিতে যাবে।
টাইমস: আগামী এক বছরের মধ্যে রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে?
আহসান এইচ মনসুর: আমি জানিনা এটা পারব কিনা। আমার লোকজন বলেছে, পারা যাবে না। আমি চেষ্টা করব।
টাইমস: ৪০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য পূরণে চ্যালেঞ্জ কোথায়?
আহসান এইচ মনসুর: অনেক অজানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ট্রাম্পের শুল্কের প্রভাব কী হবে এখনো তো আমরা জানি না। রেমিট্যান্স আয়ের ইতিবাচক ধারা আগের মতো থাকবে কিনা সেটাও জানি না। আগামী নির্বাচনটা কীভাবে হবে সেটাওতো জানিনা।
হ্যাঁ, আমরা কাজ করে যাব একটি বড় লক্ষ্য নিয়ে। বাধা তো আসবেই। আমার সামনে কোনো ক্রিস্টাল বল নেই। যে কারণে আমি পরিষ্কারভাবে দেখতেও পারছি না। কাজেই আমি চেষ্টা করে যাব ৫ শতাংশের নিচে মূল্যস্ফীতি নামাতে, রিজার্ভ ৪০ বিলিয়নের কাছে নিতে, ডলারের বিনিময় হারটা ১২১-১২২ এর আশপাশে রাখতে এবং সুদ হারটা কমিয়ে আনতে। এগুলো হচ্ছে আমার লক্ষ্য।
টাইমস: সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সির (সিবিডিসি) বিষয়ে কিছু ভাবছেন কিনা?
আহসান এইচ মনসুর: বিষয়টি নিয়ে আমরা ভাবছি। ডলার ব্যাকড ক্রিপ্টো কারেন্সি নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। আমরা শুরু করতে যাচ্ছি।
টাইমস: ক্রিপ্টো কি তাহলে অনুমোদন পাচ্ছে বাংলাদেশে?
আহসান এইচ মনসুর: ক্রিপ্টো হোক। ডলার ব্যাকড, ইউরো ব্যাকড বা ইউয়ান ব্যাকড ক্রিপ্টোতে আমার কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু মিস্টার এক্স বা মিস্টার ওয়াই একটি ক্রিপোটা কারেন্সি বাজারে ছাড়ল, আমরা সেটা অনুমোদন করব না।
টাইমস: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্বশাসনের জন্য প্রস্তুতকৃত ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডিন্যান্স ২০২৫’-এর খসড়ার সঙ্গে কী সরকার একমত হয়েছে?
আহসান এইচ মনসুর: এটা আমরা আমাদের বোর্ডে দেব। তারপর সরকারের কাছে যাবে। সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে হয়ত পাঠাতে পারব। আমরা আশা করব, সরকার এটি সুবিবেচনায় নেবে এবং পরবর্তী সরকার সংসদের মাধ্যমে আইনে পরিণত করবে।
গভর্নর হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হবে যদি আমি বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারটা বাস্তবায়ন করে যেতে পারি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে এটি এখানে সরকারি বেতন স্কেলে চলে। পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশে কিন্তু এই কাঠামো চলে না। এই স্কেলটা হবে, সরকারি বেতন স্কেলের অনেক উপরে, কিন্তু বেসরকারি খাতের বেতনের নিচে মাঝামাঝি অবস্থানে। স্বতন্ত্র পে স্কেলের বিষয়টা বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে সংযুক্ত হচ্ছে। আমি জানি বাধা আসবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে চিন্তা করতে হবে।
আর্থিক খাত ভিন্ন জিনিস। এটা মেনে নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সরকারের শৃঙ্খল থেকে বের হতে হবে। স্বাধীন হতে হবে। ক্ষমতায়ন করতে হবে গভর্নরকে। বোর্ড হতে হবে স্বাধীন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
টাইমস: ফেব্রুয়ারিতে যদি নির্বাচন হয় এবং নতুন সরকার যদি আপনাকে তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়, আপনি কী করবেন?
আহসান এইচ মনসুর: দেখুন, আমি সরকারে এসেছি কাজ করার জন্য। এখানে এসে হয়ত আমার আয় কমে ১৫ ভাগের একভাগ হয়েছে। এটা নিয়ে আমি অভিযোগ তুলছি না। কিন্তু আমাকে তো এটার বিনিময়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তাই আমি সরকারের কাছে একটা নিশ্চয়তা অবশ্যই চাইব, আমাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডিনেন্স যেটা হতে যাচ্ছে, বর্তমান সরকার যদি করে যায় পরবর্তী সরকারের কাছে আমার দাবিই হবে শুরুতেই এটা আইনে পরিণত করার। যদি আমরা এমন প্রতিশ্রুতি পাই তাহলে বুঝব পরবর্তী সরকার আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনায় আন্তরিক, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতার বিষয়ে আন্তরিক।
টাইমস: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আহসান এইচ মনসুর: আপনাকেও ধন্যবাদ।


