রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। তবে এই খুনের নেপথ্যে কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও নিহতের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে বিরোধ–এই তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
গত বুধবার রাতে কারওয়ান বাজারে স্টার হোটেলের কাছে মুছাব্বির ছাড়াও মুরাদ নামে আরেকজনকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায় দুই দুর্বৃত্ত। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মুছাব্বির এবং আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন মুরাদ।
ঘটনাস্থলে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা থাকলেও রাতের কারণে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করা কঠিণ হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে ডিবির বিশেষ তৎপরতা
হত্যাকাণ্ডের পর থেকে থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি ও র্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। ইতোমধ্যে নিহতের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মিলনসহ মোট পাঁটজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তেজগাঁও থানার সাব-ইন্সপেক্টর শরীফ আনোয়ার।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ফজলুল করিম জানান, মুছাব্বিরকে অনুসরণ করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মুছাব্বির নিয়মিত তেজতুরী বাজার ও স্টার কাবারের পেছনের গলিতে যেতেন। খুনিরা সম্ভবত আগে থেকেই সেখানে ওত পেতে ছিল।’
নেপথ্যে কি চাঁদাবাজি?
কারওয়ান বাজারের একাধিক ব্যবসায়ীর মতে, গত কয়েকদিন ধরে ওই এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ে উত্তেজনা চলছিল। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স্থানীয় যুবদল নেতা রহমান, রাসেল ও জালালসহ কয়েকজন এই চাঁদাবাজিতে জড়িত। চাঁদার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে মুছাব্বিরের সঙ্গে তাদের বিরোধ তৈরি হয়েছিল, যার জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। ঘটনার সময় গুলিতে আহত কারওয়ান বাজার ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদ বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার জবানবন্দি তদন্তে বড় মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএনপি ও স্বজনদের বক্তব্য
হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার বলেন, ‘এটি দলের অভ্যন্তরীণ কোনো কোন্দল মনে হচ্ছে না। ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ এর পেছনে থাকতে পারে।’ অন্যদিকে, নিহত মুছাব্বিরের ঘনিষ্ঠ রিয়াজের দাবি, রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হওয়ার কারণেই মুছাব্বিরকে টার্গেট করা হয়েছে।
নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বৃহস্পতিবার তেজগাঁও থানায় ৪-৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেছেন। তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈন্যু মারমা জানান, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে, তবে রাতের ফুটেজ স্পষ্ট না হওয়ায় অপরাধীদের চিনতে কিছুটা সময় লাগছে।
জানাজা ও দাফন সম্পন্ন
বৃহস্পতিবার বাদ জোহর নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মুছাব্বিরের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপি নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেল, আমিনুল হকসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। কারওয়ান বাজারে দ্বিতীয় জানাজা শেষে মরদেহ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মুক্তি ও জনমনে আতঙ্ক
কারওয়ান বাজারের মতো ব্যস্ততম সড়কে এই হত্যাকাণ্ড ব্যবসায়ী ও জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গত দেড় বছরে আটজন শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সন্ত্রাসী কারামুক্ত হয়ে ফের অপরাধ জগতে সক্রিয় হওয়ায় উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সাড়ে আট মাসে বিশেষ ক্ষমতা আইনে কারাগারে থাকা ৪২৬ জন জামিনে মুক্তি পান। এদের মধ্যে পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদপুরের ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, মগবাজারের এস এম আরমান ওরফে আরমান, মিরপুরের আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস, ধানমন্ডির খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন, বাড্ডার খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসু ও সোহেল রানা চৌধুরী ওরফে ফ্রিডম সোহেল, তেজগাঁওয়ের শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম এবং হাজারীবাগের সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমনের নাম বিশেষভাবে আলোচিত। দীর্ঘ এক থেকে দেড় দশক কারাভোগের পর তারা মুক্তি পেয়ে বর্তমানে আদালতে হাজিরা না দিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণে নতুন করে তৎপর হয়েছেন বলে মনে করছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে রাজধানীতে অন্তত পাঁচটি বড় হত্যাকাণ্ডে এই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম উঠে এসেছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর রায়েরবাজারে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পিচ্চি হেলালের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া হাতিরঝিলে যুবদল নেতা আরিফ শিকদার ও বাড্ডায় বিএনপি নেতা কামরুল আহসান হত্যাকাণ্ডের পেছনে সুব্রত বাইন এবং আদালত এলাকায় তারিক সাঈদ মামুন হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইমনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে ফোর স্টার গ্রুপের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ।
জামিন পেয়ে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে গত ২৭ মে কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হলেও অন্যদের তৎপরতায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে।


