মিয়ানমারের উত্তরের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ভয়াবহ যুদ্ধের পেছনে রয়েছে মহামূল্যবান ‘জেড স্টোন’। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান জেড খনিগুলোর অবস্থান দেশটির কাচিন রাজ্যে। এমনকি কাচিনের হপাকান্তকে জেড স্টোনের রাজধানী বলা হয়।
গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমারে গত কয়েকবছর ধরেই বিভিন্ন পাহারে ছড়িয়ে থাকা এসব জেড খনির দখলে আছে কাচিন স্বাধীনতা বাহিনী (কেআইএ)। এরই মধ্যে এসব খনির দখল নিতে স্থল ও আকাশপথে কেআইএ’র সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়েছে দেশটির সামরিক জান্তারা।
জান্তা সরকারের ৩৩ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের সেনারা, মিন জিন থান্তের ওয়ারাজুপ মিলিশিয়ার সহায়তায় মাওমাওবওয়ান, লেমাউনকন পাহাড় ও সাইনথ্যাং গ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, এরইমধ্যে এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে কাচিনের কাছাকাছি পাহাড়ি অঞ্চলে ঢুকে পড়েছে জান্তা বাহিনী। আকাশপথে কেআইএ’র প্রতিরোধ ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক ড্রোন ও বিমান হামলা চলছে। তবে মায়ানমারের সেনারা পাহাড়ের ঢালে পৌঁছেছে কিনা তা নিশ্চিত নয়।
গত এপ্রিলে শুরু হওয়া এই অভিযানকে ২০২১ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পর মায়ানমারের উত্তরাঞ্চলে জান্তা বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেআইএ বিরোধী এই অভিযানটি সফলভাবে পরিচালনার জন্য মাইতিক্যিনা–কমেইং–হপাকান্ত সড়কে প্রায় একমাস প্রস্তুতি নিয়েছে জান্তা বাহিনী।

জেড খনির এই পাহাড়গুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া মানে পুরো হপাকান্ত এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, লেমাউনকন ও মাওমাওবওয়ান পাহাড় থেকে হপাকান্তের পুরো খনি এলাকাই নজরদারিতে রাখা যায়। অর্থাৎ, যিনি এই পাহাড় নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনিই পুরো জেড-বেসিন (খনি) নিয়ন্ত্রণ করেন।
কেআইএ এবং তাদের সশস্ত্র মিত্ররা ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট লেমাউনকন পাহাড় দখল করে এটিকে জেড খনিগুলোর প্রতিরক্ষা দুর্গে পরিণত করে। এটিই এখন প্রতিরোধ জোটের প্রতিরক্ষা কাঠামোর প্রধান অংশ।
কেআইএ’র এক প্রতিরোধ যোদ্ধা বলেন, ‘যদি তারা ওই দুই পাহাড় দখল করে ফেলে, তাহলে পুরো এলাকাই তাদের অধীনে চলে যাবে। এই খনিগুলো হারালে আমাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।’
কেআইএ মুখপাত্র কর্নেল নও বুঃ বলেন, ‘লেমাউনকন ছিল তাদের (সামরিক বাহিনীর) সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটিগুলোর একটি। সেখান থেকে হপাকান্ত পুরোপুরি দেখা যায়। এজন্যই জান্তা বাহিনী যেকোনো মূল্যে এটি ফিরে পেতে চায়।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রক্তপাতের পেছনে রয়েছে আরও গভীর একটি কারণ- অর্থ। হপাকান্তের জেড খনিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মায়ানমারের ‘ছায়া অর্থনীতির’ প্রাণ। একইসঙ্গে কেআইএ ও অন্য বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ উৎস। দেশ বিদেশে জেড স্টোন বিক্রি করেই অস্ত্র ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ বহন করছে এসব প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো। কাজেই কাচিনের জেড খনিগুলো ফিরে পাওয়া মানে শুধু ভূখণ্ড নয়, জান্তাবিরোধী শক্তিগুলোকেও অর্থনৈতিকভবাএ দুর্বল করে দেওয়া।
কাচিনের রাজনীতিবিদ বিশ্লেষক শাবা বলেন, ‘এটা শুধু ভূমির লড়াই নয়। এটা জেড খনি নিয়ন্ত্রণের লড়াই, এটি সেই অর্থের লড়াই যা যুদ্ধ চালায়। যে হপাকান্ত নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই পুরো অর্থের স্রোত নিয়ন্ত্রণ করবে।’


