রাজধানী ঢাকার আবহাওয়া অফিসের থার্মোমিটারে হয়তো দেখাচ্ছে বাইরের তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু মানুষের শরীর বলছে অন্য কথা, গরমে শরীর যেন ৪২ ডিগ্রির মতো পুড়ছে।
মঙ্গলবার ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। কিন্তু লাখ লাখ মানুষ তাদের মোবাইল ফোনের অ্যাপে দেখছিলেন আসল অনুভূতি বা ‘ফিলস লাইক’ তাপমাত্রা এর চেয়ে আরও ছয় ডিগ্রি বেশি।
যন্ত্রে আবহাওয়ার হিসাব আর মানুষের আসল কষ্টের মধ্যে এখন মস্ত বড় এক ফাঁক তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে ঢাকায় বাইরে বের হলে মনে হয় না যে এটি কোনো সাধারণ দুপুর, বরং মনে হয় কেউ যেন কোনো চালু জেট ইঞ্জিনের গরম বাতাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সরকারি হিসাবের চেয়ে এই গরম অনেক বেশি কড়া, আর এতে পুরোপুরি কাহিল হয়ে পড়ছেন মানুষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ফাতেমা আক্তারের মতে, এই ‘অনুভূত’ তাপমাত্রা কেবল মুখের কথা নয়, বরং গরম কীভাবে মানুষের শরীরকে কষ্ট দিচ্ছে–এটি তারই প্রমাণ।
তিনি জানান, বাতাস কতটা ভেজা বা আদ্র, বাতাসের গতি কেমন এবং চারপাশের পরিবেশ কেমন—এই তিনটি কারণে তাপমাত্রার এমন তফাত হয়। ঢাকার ক্ষেত্রে আসল দোষী হলো বাতাসের আদ্রতা। বাতাসে যখন জলীয় বাষ্প বেশি থাকে, তখন শরীরের ঘাম শুকাতে চায় না। আমাদের শরীর নিজে নিজে ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য ঘাম বাষ্প করার যে স্বাভাবিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে, বাতাসে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প থাকায় তা আর কাজ করতে পারে না। ফলে শরীরের চামড়ার সাথে গরম লেপ্টে থাকে, ভেতরের শীতল করার ব্যবস্থাটি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
এই অবস্থা এখন মধ্যপ্রাচ্যের চড়া গরমের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ঠিক একই দিনে সমুদ্রের কাছের শহর দুবাইয়ের তাপমাত্রা ছিল ঢাকার মতোই ৩৬ ডিগ্রি। কিন্তু ওখানকার সাগরের আদ্রতার কারণে মানুষের কষ্ট ৪৪ ডিগ্রির মতো লাগছিল।
অন্যদিকে, মরুভূমির শহর রিয়াদে আসল তাপমাত্রা এবং অনুভূত তাপমাত্রা দুটোই ছিল সমান–৪৫ ডিগ্রি। কারণ, ওখানকার বাতাস শুকনো হওয়ায় ঘাম সঙ্গে সঙ্গে শুকিয়ে যায়, শরীরের স্বাভাবিক ঠাণ্ডা হওয়ার নিয়মটি কাজ করে। ঢাকা মরুভূমি না হলেও এখানকার গাদাগাদি করে থাকা ইটের দালান আর দমবন্ধ করা আদ্রতা ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে কষ্টদায়ক গরমের শহরগুলোর সমান লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
জনজীবনে গরমের ধকল
যারা খোলা আকাশের নিচে কাজ করে খান, তাদের জন্য এই গরমে বেঁচে থাকাটাই একটা বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তপ্ত রাস্তায় রিকশা চালানো আব্দুল করিম এই কষ্টকে শারীরিক নির্যাতন বলে মনে করেন। রোদ আর গরমে শরীর যেন আক্ষরিক অর্থেই পুড়ে যায়, তাই একটু পর পর প্রচুর পানি খাওয়া ছাড়া এই কষ্টের কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
আরও ভয়ের কথা হলো, এই তীব্র গরমের কারণে মানুষ ঘরের বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে চালকরা এক আজব বিপদে পড়েছেন—ঘরে বসে থাকলে আয় বন্ধ, আবার বাইরে বের হলেও যাত্রী মিলছে না।
এমনকি যারা রাস্তায় শারীরিক খাটুনির কাজ করেন না, অফিসে যাতায়াত করতে গিয়ে তারাও কোনো আরাম পাচ্ছেন না। অফিসযাত্রীরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে যাওয়া-আসার পথটি এখন এক যন্ত্রণার নাম। কেবল বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকাও যেন শরীরের শক্তি শেষ করে দেয়। তারা বলছেন, তাপমাত্রা হয়তো কাগজে-কলমে অত বেশি দেখায় না। কিন্তু চারপাশের বাতাস একদম জমে থাকে। ফলে বাইরে পা রাখার কয়েক মিনিটের মধ্যেই শরীর দিয়ে গলগল করে ঘাম ঝরতে থাকে।
এই ভারী ও ভেজা বাতাসের কারণেই বাংলাদেশকে মরুভূমির মতোই যন্ত্রণাদায়ক মনে হয়। আবহাওয়া বিজ্ঞানের শিক্ষক ফাতেমা আক্তার বলেন, দেশের এই একটানা আদ্রতা দক্ষিণ এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের গরমের তফাতটা ঘুচিয়ে দেয়।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, বাংলাদেশে কেবল তাপমাত্রা বাড়লেই তাকে তাপপ্রবাহ বলে না, তা কতদিন থাকছে সেটাও দেখা হয়। যদি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা টানা তিন দিন ৩৬ ডিগ্রি বা তার বেশি থাকে, তবেই তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাপপ্রবাহ বলা হয়। মার্চ থেকে মে মাসের বর্ষার আগের সময়টাতে এই কষ্ট খুবই চেনা ছবি, যা গ্রীষ্মের বৃষ্টি এসে ধুয়ে না দেওয়া পর্যন্ত রাজধানীকে এভাবে দমবন্ধ করে আটকে রাখে।
চিন্তা বাড়াচ্ছে শক্তিশালী এল নিনোর ভয়
বাংলাদেশ যখন নিজের গরম নিয়ে হাঁসফাঁস করছে, তখন আবহাওয়াবিদরা চিন্তিত হয়ে তাকাচ্ছেন প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে। সেখানে জলবায়ুর একটা বড় ওলটপালট শুরু হচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের পানি দ্রুত গরম হওয়ার কারণে পৃথিবীতে বড় ধরনের ‘এল নিনো’ ধেয়ে আসছে। তাদের নতুন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে এল নিনো পুরোপুরি জেঁকে বসার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এটি টিকে থাকার ভয় ৯০ শতাংশের বেশি।
এটি কেবল সাধারণ কোনো আবহাওয়ার বদল নয়, এটি পুরো পৃথিবীর জলবায়ুর নিয়ম ওলটপালট করে দিতে পারে। ফাতেমা আক্তার জানান, এল নিনো একটি স্বাভাবিক নিয়ম যা প্রতি পাঁচ থেকে সাত বছর পর পর সমুদ্রের ওপরের পানি গরম হওয়ার কারণে ঘটে। তবে বর্তমানে সমুদ্রের পানি যেভাবে গরম হচ্ছে, তাতে একটি অতি শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক ‘সুপার এল নিনো’ তৈরি হতে পারে।
তিনি হুঁশিয়ারি দেন, সমুদ্রের এই গরমের ধাক্কা যখন ডাঙ্গায় এসে পড়বে, তখন পৃথিবী দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে—কোথাও হয়তো দেখা দেবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খরা, আবার কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টিতে সব ভেসে যাবে। পৃথিবীর গরম যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তবে আবহাওয়ার এই রূপ আরও ভয়ংকর হবে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাসেও এমন উল্টোপাল্টা পরিস্থিতির কথাই বলা হয়েছে। আগামী মাসগুলোতে প্রায় পুরো পৃথিবীতেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম পড়ার কথা বলা হয়েছে।
এল নিনো মূলত পৃথিবীর তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়িয়ে দেয় এবং চেনা বৃষ্টির নিয়ম বদলে দেয়। এর ফলে পৃথিবীর একপাশে বন্যা হলে অন্যপাশে খরা আর তীব্র গরম দেখা দেয়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রধান চেলেস্তে সাউলো জল ও স্থলভাগের এই দুই বিপদের কথা জানিয়ে সব দেশের সরকার, কৃষি, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ বিভাগকে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এই পূর্বাভাস আরও চিন্তার কারণ তৈরি করেছে। এবার বর্ষাকালে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হওয়ার বড় আশঙ্কা আছে। যদিও মাঝে মাঝে হওয়া গ্রীষ্মের বৃষ্টি ঢাকা বা অন্য শহরগুলোকে সাময়িকভাবে একটু ঠাণ্ডা করতে পারে, তবে বর্ষার বৃষ্টি কমে গেলে দীর্ঘ মেয়াদে পানির অভাব, ফসলের ক্ষতি এবং গরম আরও বেড়ে যাওয়ার মতো বড় বিপদ দেখা দিতে পারে।
স্বস্তির কী কোনো আশা আছে?
আপাতত এই কষ্ট কমার কোনো লক্ষণ নেই। আবহাওয়া অফিস নিশ্চিত করেছে এই ‘মৃদু’ তাপপ্রবাহ এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি কেবল ঢাকা নয়-নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরের পাশাপাশি রংপুর, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ওপর দিয়েও বইছে।
তবে কষ্টের পর অবশেষে একটু স্বস্তির আলো দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মৌসুমী বাতাস টেকনাফ উপকূল পর্যন্ত চলে আসতে পারে। আর তা হলেই এই গরম কাটাতে বহু প্রতীক্ষিত বৃষ্টি আর বজ্রঝড় শুরু হবে।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, এই বৃষ্টি গরমের তেজ কমিয়ে দিলেও স্বস্তি একবারে আসবে না। বরং দফায় দফায় বৃষ্টি হবে। বুধবার ৩ জুনের পর অন্তত তিন দিন থেমে থেমে এই বৃষ্টি চলতে পারে।
আবহাওয়া অফিসের পাঁচ দিনের হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি লঘুচাপ তৈরি হয়ে আছে। এটি হঠাৎ বজ্রঝড় আর ভারী বৃষ্টির জন্য একদম উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করছে। কিন্তু যতদিন না সেই মেঘ থেকে বৃষ্টি নামছে, ততদিন ঢাকার মানুষ এক অস্বস্তির মধ্যে আটকে আছেন। তারা এমন এক গরমে দিন কাটাচ্ছেন যা আরব দেশের কথা মনে করায়, আর ভাবছেন সামনের দিনগুলোতে আবহাওয়া আরও কতটা ভয়ংকর রূপ নেয়।


