১৭ ফেব্রুয়ারি। বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, এক শূন্যতার স্মরণ।
২০০৮ সালের এই দিনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে চলে যান মান্না। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এক নায়ক হঠাৎ বিদায় নিলে যে ধাক্কা লাগে, ঢাকাই সিনেমা সেটাই অনুভব করেছিল।
মান্না ছিলেন আপাদমস্তক চলচ্চিত্রের মানুষ। তার ধ্যানজ্ঞান, সময়, সম্পর্ক–সবকিছুই আবর্তিত হতো সিনেমাকে ঘিরে। একটি ছবি মুক্তি পেলে তিনি নাকি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে বসে থাকতেন। ছবি না চললে কেঁদে ফেলতেন। যেন ব্যক্তিগত ব্যর্থতা।
নির্মাতা কাজী হায়াৎ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মান্না পোড় খেতে খেতেই বড় হয়েছেন। সেই পোড়খাওয়া অভিজ্ঞতাই তাকে জনতার নায়ক বানিয়েছে।
মান্নার পুরো নাম এ এস এম আসলাম তালুকদার। ১৯৬৪ সালের ৬ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে জন্ম। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকায় এসে একটি বিজ্ঞাপন তার জীবন ঘুরিয়ে দেয়। এফডিসির ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে ১৯৮৪ সালে চলচ্চিত্রে যাত্রা। প্রথম অভিনীত ছবি ‘তওবা’, তবে প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাগলী’।
১৯৯১ সালে ‘কাসেম মালার প্রেম’ তাকে একক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। প্রায় চার শতাধিক ছবিতে অভিনয়। শতাধিক পরিচালক ও ৬১ জন নায়িকার সঙ্গে কাজ। প্রযোজক হিসেবেও ছিলেন সফল; তার প্রতিষ্ঠান ‘কৃতাঞ্জলি চলচ্চিত্র’ নব্বইয়ের দশকে একের পর এক ব্যবসাসফল ছবি উপহার দেয়।
মান্নার আলাদা পরিচয় তৈরি হয় বক্তব্যধর্মী ছবিতে। নব্বইয়ের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ছাত্ররাজনীতি, বেকারত্ব, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, সুবিধাবাদী নেতৃত্ব—এই সব জটিল বাস্তবতাকে বাণিজ্যিক ছবির ভাষায় তুলে ধরেছিলেন তিনি।
‘যন্ত্রণা’য় বেকার তরুণদের বিপথগামিতা, ‘দাঙ্গা’য় স্বাধীনতাপরবর্তী রাষ্ট্রের দুর্নীতি, ‘ত্রাস’–এ শিক্ষাঙ্গনের সন্ত্রাস, ‘দেশদ্রোহী’তে ক্যাডার রাজনীতির নির্মম ব্যবহার–প্রতিটি ছবিতে মান্না ছিলেন সমাজের প্রতিবাদী কণ্ঠ।
‘দাঙ্গা’ ছবিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে তার বলা সংলাপ আজও আলোচিত। ধর্ষনের শিকার মেয়েকে জাতীয় পতাকায় ঢেকে দেওয়ার দৃশ্যটি তখনকার দর্শককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ‘লুটতরাজ’, ‘তেজী’, ‘ধর’, ‘কষ্ট’, ‘আমি জেল থেকে বলছি’—প্রতিটি ছবিতে অপরাধের ভেতরের মানবিক সংকটকে তুলে ধরেছেন তিনি।
‘আম্মাজান’ শুধু একটি ব্যবসাসফল ছবি নয়, মান্নার ক্যারিয়ারের আবেগঘন অধ্যায়। মাতৃভক্তির যে তীব্রতা তিনি পর্দায় দেখিয়েছেন, তা দর্শককে কাঁদিয়েছে। কাজী হায়াৎ বলেছেন, ছবির টাইটেল গানের দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে মান্না সত্যি সত্যিই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন।
অনেকে তাকে অ্যাকশন নায়ক বলেই চেনেন। কিন্তু তার অভিনয়ের ভেতরে ছিল ভয়েস কন্ট্রোল, সংলাপের রিদম, চোখের ভাষা। ‘কষ্ট’ ছবিতে মানসিক যন্ত্রণায় ভোগা মানুষের চরিত্রে তার অভিনয় যেমন স্মরণীয়, তেমনি ‘রাজধানী’তে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ঠাণ্ডা মাথার চরিত্রেও তিনি বিশ্বাসযোগ্য।
একটা সময় বলা হতো, ঢাকাই ছবির সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক হয়েও তিনি সবচেয়ে বেশি গুন্ডা ও পুলিশ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই বৈপরীত্যই তাকে আলাদা করেছে।
মান্না অনন্তের পথে পাড়ি জমিয়েছেন ১৮ বছর আগে। কিন্তু জনতার নায়ক হিসেবে তার জায়গা এখনও অটুট। আজও যখন ঢাকাই ছবির সংকট নিয়ে আলোচনা ওঠে, তার নাম ফিরে আসে।
কারণ, তিনি দেখিয়েছিলেন–বিনোদনের ভেতরেও বক্তব্য থাকতে পারে, বাণিজ্যিক ছবিও সমাজের আয়না হতে পারে।


