টাইমস অব বাংলাদেশ দীর্ঘ অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করেছে। ব্যবসায়ী মো. শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ভুতুড়ে জাহাজ কেনার আড়ালে অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে বিপুল অর্থ পাচার ও কর ফাঁকি দিয়েছেন। এ বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো মঙ্গলবার।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূলে জাহাজ ভাঙা শিল্পের আড়ালে এস এন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীর অর্থ পাচারের এক অন্ধকার ইতিহাস উন্মোচিত হয়েছে।
এই পাচারের কাজে তিনি বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংককে ব্যবহার করেছেন, ফাঁকি দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলোকে। কিন্তু তারপরও অদৃশ্য থেকে গেছে গোটা কেলেঙ্কারিটা। কারণ, কোনো এক অদ্ভুত নীরবতায় চোখ বুজে ছিল বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে আসা সরকারি ও আন্তর্জাতিক নথি বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে, দেশের অন্যতম শীর্ষ জাহাজভাঙা ব্যবসায়ী শওকত আলীর বিদেশে অর্থ পাচারের বিস্ফোরক তথ্য।
নথিগুলো বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এস এন করপোরেশন অন্তত দুটি ‘ভুতুড়ে জাহাজ’ আমদানির নামে বিদেশে কোটি কোটি ডলার পাঠিয়েছে–যেসব জাহাজের অস্তিত্বই কোনো বন্দর নিবন্ধন বা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলোর ডেটাবেজে নেই। এই কাগুজে জাহাজ দুটির আড়ালে পাচার হয়েছে প্রায় প্রায় ২৬ দশমিক ৪ কোটি টাকা।
এস এন করপোরেশনের আমদানি করা ৩৮৫টি জাহাজের মধ্যে ২১টির নথি বিশ্লেষণ করে এই টাকা পাচারের প্রমাণ পেয়েছে টাইমস।
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কর্মকর্তারা মনে করছেন, বাকি জাহাজগুলোর নথি খতিয়ে দেখলে আরও বড় অঙ্কের টাকা পাচারের চিত্র মিলবে। কিন্তু শওকত আলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নিজেদের অক্ষমতার কথাও স্বীকার করেছেন তারা।
এস এন করপোরেশন যে দুইটি অস্তিত্বহীন জাহাজের নামে অর্থ পাঠিয়েছে এর একটি হলো এমভি কাই হ্যাং-৩। আমদানি নথিতে এটিকে ৩ হাজার ৯০৬ টন ওজনের কনটেইনার জাহাজ হিসেবে দেখানো হয়। দাম ধরা হয় প্রায় ১৭ লাখ ডলার।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই আইএমও নম্বর (৭৪৩৫৬৭৮)-এর কোনো জাহাজই বৈশ্বিক কোনো ডেটাবেজে নেই। ভেসেল ট্র্যাকার, মেরিন ট্রাফিক এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা আইএমও–কোনো জায়গাতেই ওই নম্বরের কোনো জাহাজের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। একমাত্র মিল পাওয়া যায় একই নামের একটি ভিন্ন জাহাজের, যার আইএমও নম্বর, ওজন ও মাপ সবই আলাদা। এতে প্রমাণ মেলে পুরো আমদানিই ছিল একটি জাল লেনদেন।
এই ভুতুড়ে জাহাজ আমদানির নামে পাঠানো অর্থ সিঙ্গাপুরে গেছে বলে টাইমসের অনুসন্ধানে জানা গেছে। এমন আরও একটি লেনদেনের সূত্র পাওয়া গেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের রেকর্ডে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকটির চট্টগ্রাম শাখা থেকে ৪ দশমিক ৬৪ লাখ ডলারের একটি এলসি (ঋণপত্র) খোলা হয় আরেকটি তথাকথিত জাহাজ আমদানির জন্য। কিন্তু সরকারি নথি বলছে, ওই বছর এস এন করপোরেশনের নামে কোনো জাহাজ দেশে প্রবেশ করেনি।
২০২০ সালের আগে প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ১ দশমিক ৮৩৫ টনের একটি মঙ্গোলিয়ান পতাকাবাহী জাহাজ আমদানি করেছিল। এসডাব্লিউ–২ নামের জাহাজটির দাম পড়েছিল প্রায় ৭ লাখ ডলার। এর ঠিক পরের আমদানিটি ২০২১ সালের এপ্রিলে–লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ১০ হাজার ১৫৬ টনের এমভি রিগেল, যার দাম ছিল প্রায় ৪৫ দশমিক ৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ ২০২০ সালের এলসির বিপরীতে কোনো জাহাজ আসেনি, কিন্তু স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ডলার উধাও হয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে এই দুটি ভুতুড়ে জাহাজের আড়ালে পাচার হয়েছে অন্তত ২১ দশমিক ৬৪ লাখ ডলার। জাহাজের কেনাবেচা নিয়ে খোঁজ রাখা আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা বার্নডইউ’র মাধ্যমে জাহাজগুলোর বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত হয়েছে টাইমস।
২০২৩ সালের জুনে বিএফআইইউ শওকতের অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্ত শুরু করে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে উঠে আসে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক যাচাই-বাছাই ছাড়াই এস এন করপোরেশনের নামে একটি এলসি অনুমোদন করে, যার টাকা পাঠানো হয় ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে নিবন্ধিত ট্যালেন্ট মাইল লিমিটেড নামের একটি অফশোর কোম্পানিতে। অর্থাৎ বিদেশি শেল কোম্পানি ব্যবহার করে পাচারের নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছিল। তদন্তটি পরে হঠাৎ থেমে যায়।
এদিকে আরও অনুসন্ধান করে টাইমস দেখতে পেয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে এস এন করপোরেশন গোপনে আমদানি করে সুবর্ণ স্বরাজ্য নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকার। জাহাজটি সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের পতাকাবাহী। ভ্যাসেল ট্র্যাকারের রেকর্ড ঘেটে দেখা গেছে, লোহিত সাগর পেরিয়ে সুয়েজ খালে ঢোকার পর হঠাৎ ট্র্যাকিং সিগন্যাল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২১ জুনের পর থেকে জাহাজটির কোনো আন্তর্জাতিক ট্র্যাকিং রেকর্ড আর পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহাজটি বিষাক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে সিগন্যাল বন্ধ করা হয় এবং গোপনে চট্টগ্রামের এস এন করপোরেশনের ইউনিট–২ ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য ওঠানো হয়।
এরপর ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ওই ইয়ার্ডে। এই জাহাজটি কাটার সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। ছয় শ্রমিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন, আরও ছয়জন গুরুতর দগ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
সরকারি তদন্তে দেখা যায়, কাটিং কাজ শুরু হওয়ার আগে কোনো সেফটি চেক হয়নি। কারণ, হিসেবে উল্লেখ করা হয় দাহ্য পদার্থ ও মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতা। গত এক দশকে এস এন করপোরেশনের ইয়ার্ডগুলোতে কমপক্ষে নয়জন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে।
১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামভিত্তিক এস এন করপোরেশন শওকত আলী ও তার স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারীনের মালিকানাধীন। শওকত বর্তমানে বেসরকারি খাতের ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান। অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী এই পদে তার থাকার কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টাইমসকে বলেন, ‘অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেবে। শুধু ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে অপসারণ নয়, সম্পদ জব্দ ও পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনে মামলা করবে সরকার।’
গত ১৫ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার ফোন ও বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। তাই তার বক্তব্য ছাড়া সংবাদটি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে টাইমস অব বাংলাদেশ।


