দেশের জরুরি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে টাইমস অব বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বানিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বিলম্বিত করার ষড়যন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিএনপির অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন, কথা বলেছেন দল ক্ষমতায় ফিরলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকা প্রসঙ্গেও।
বনানীর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এ বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন টাইমস এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক অম্লান দেওয়ান এবং বিশেষ প্রতিনিধি মোশাররফ বাবলু।
ভিডিও সাক্ষাৎকারটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
টাইমস : ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে কিনা এ নিয়ে নানা মহলে আশঙ্কা রয়েছে। আপনি কী মনে করেন?
আমির খসরু: আমরা যদি ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখব গণঅভ্যুত্থানের পর যে দেশ যত তাড়াতাড়ি গনতান্ত্রিক ধারায় ফিরেছে, সে দেশ তত এগিয়ে গেছে। অন্যদিকে, যে সব দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হয়েছে সেসব দেশে গৃহযুদ্ধ দেখা গেছে।
আমার মনে হয়, আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। বাংলাদেশের নির্বাচন আরো অনেক আগেই হয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
নির্বাচন দিতে যত দেরি হবে বাংলাদেশ তত পিছিয়ে যাবে। বাংলাদেশের মানুষ তাদের মালিকানা ফেরত পেতে রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে লড়াই করেছে। জনগনের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে সরকারের কাছে নির্বাচন ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। আশা করব, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশে খুব দ্রুত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ফিরিয়ে আনতে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
আমি যদি দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কথা বলি, তাহলে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা কিংবা পুলিশ ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। পুলিশকে এককভাবে দোষ দিচ্ছি না। কারণ নির্বাচিত সরকার না থাকলে আসলে কোনো অথরিটি কাজ করে না।
শেখ হাসিনার সবচাইতে বড় সমস্যা হলো তিনি কারো মতামতের তোয়াক্কা করতেন না। নিজে যে সিদ্ধান্ত নিতেন সেটাই মনে করতেন সঠিক। তিনি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতেন না। নির্বাচিত কোনো সরকার ছিল না, সংসদ ছিল না। তারা নিজেরাই ছিলেন সবকিছু। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র পথ হচ্ছে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সংসদে আসা এবং সরকার গঠন করা।
টাইমস: ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর নেতৃত্বাধীন সরকার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
আমির খসরু: দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা বলে কিছু নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ সব ব্যাপারে মানুষ সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছে এই ভেবে যে, নির্বাচনের পরে সবকিছু করবে। এ অবস্থায় একটাই দাবি যথাসময়ে যেন সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন হয়।
টাইমস: দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা সন্দেহ সংশয় রয়েই গেছে। এভাবে চলতে থাকলে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে কী?
আমির খসরু : নির্বাচন নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র হচ্ছে। অনেকে অনেক কথা বলছেন। এরপরও দেশের মানুষ যথাসময়ে নির্বাচন চায়। যথাসময়ে নির্বাচন করতে না পারলে যারা দেশের এত বড় ক্ষতি করে পালিয়ে গেছে তাদের জন্য স্পেস তৈরি হবে। নির্বাচন নিয়ে হেলাফেলা করা মানে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়াদের সুবিধা করে দেওয়া। এরই মধ্যে তাদের সেই তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে।
টাইমস: শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটাতে ১৫ বছর সময় লাগল কেন? এ ব্যর্থতার দায় কি বিএনপি এড়াতে পারে?
আমির খসরু: বিএনপি কিছু না করলে ৬০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয় কী করে! হাজার হাজার নেতাকর্মী গুম হয় কী করে!
রাজনৈতিক সরকার যখন খারাপ কাজ করে, রাষ্ট্রযন্ত্র যখন সন্ত্রাসী হয়ে ওঠে, তখন তাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য তো আমাদের হাতে অস্ত্র ছিল না। আমরা মাঠে নামলেই ওরা গুলি করেছে, গুম করেছে, খুন করেছে।
এরকম একটা শক্তির মোকাবেলা করতে গিয়ে যদি আমরা অস্ত্র হাতে তুলে নিতাম তাহলে তো দেশে গৃহযুদ্ধ বেধে যেত।
টাইমস: তাহলে নিরস্ত্র ছাত্ররা কীভাবে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটাল?
আমির খসরু : ছাত্রদের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে এটাও ঠিক যে, ছাত্রদের পেছনে সবচাইতে বড় শক্তি হিসাবে কাজ করেছে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলো। শেখ হাসিনা যেদিন পালিয়ে যায় সেদিনও আমি কারাগারে ছিলাম। সেদিনও হাজার হাজার মানুষকে ধরে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরাই সবচাইতে বেশি প্রাণ দিয়েছে।
টাইমস: কেউ কেউ বলছেন, হাসিনার পতনে বিএনপির তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। এ ব্যাপারে কী বলবেন?
আমির খসরু : কে কী প্রচারণা চালাচ্ছে সেটা নিয়ে আমার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি কীভাবে কাজ করেছে, বিএনপির কত হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কতগুলো মামলা হয়েছে, কত নেতাকর্মী জেল খেটেছেন, জুলাই-আগস্টে বিএনপির কত নেতাকর্মী পুলিশের গুলিতে মারা গেছে, ছাত্রলীগের গুলিতে মারা গেছে-এসবেরই তো রেকর্ড আছে।
আর ছাত্রদের কথা যদি বলতেই হয় সেখানেও তো ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছিল। বামপন্থীরা ছিল, শিবিরও ছিল।
আমরা এত বড় আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করতে চাই না। তবে বিএনপিকে অবশ্যই প্রাপ্য কৃতিত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রচেষ্টায় ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ছোট ছোট শিশুরা পর্যন্ত হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে।
টাইমস: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বাংলাদেশের দুটি অ্যাকাউন্টে ৩০ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত জানতে চাই।
আমির খসরু: এগুলোর বিষয়ে কোনো প্রমাণ যেহেতু আমার হাতে নেই, সেহেতু এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
আমি যেটা দেখেছি বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটির মানুষ সবাই রাস্তায় নেমেছে। আর সেটার ফলে যে সফলতা এসেছে তার জন্য তাদের কৃতিত্ব না দিয়ে যদি বলেন আমেরিকা জিতে গেছে, এটা হবে আমাদের দুর্ভাগ্য।
টাইমস: আপনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা বললেন। বিএনপি মহাসচিব সম্প্রতি টাইমস অব বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম ডেমোক্রেসি কিন্তু পেয়েছি মবোক্রেসি।’ এই বক্তব্য সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
আমির খসরু : মবোক্রেসি দিয়ে গণতন্ত্র চলতে পারে না। গণতন্ত্রের জন্য আপনাকে সহনশীল হতে হবে। অন্যের সঙ্গে দ্বিমত হলেও তার মতামতকে সম্মান দেখাতে হবে। এটাই হলো গণতন্ত্র। সুতরাং আপনি গণতন্ত্রের কথা বলে যদি মবোক্রেসি চালান তার মানে আপনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না।
টাইমস : আপনি তো বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়গুলো দেখভাল করেন। গত এক বছরে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন দেখছেন কী? বর্তমান সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের যদি অবনতি না হয় তাহলে তারা পুশইন ও পুশব্যাক করছে কেন?
আমির খসরু: আমরা সবাই জানি, পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যাসহ বাংলাদেশের অনেক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো সমাধান হয়নি। দেশের মানুষের বিরুদ্ধে গুম, খুনসহ নানা অভিযোগ সত্বেও তারা হাসিনার নির্বাচনকে বৈধতা দিয়েছে। এখন আওয়ামী লীগের লোকজন প্রকাশ্যে বলছে তাদের লোকজন দিল্লিতে আছে। তারা শিগগিরই দেশে ফিরবে। এসব কথা বলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক একেবারে নিম্নপর্যায়ে চলে গেছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য তিনটা মৌলিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। প্রথমত পরস্পরের প্রতি সম্মান, দ্বিতীয়ত পরস্পরের স্বার্থ রক্ষা, তৃতীয়ত কারো অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা।
ভবিষ্যতে এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হলে ভারতকে নীতিগুলো মেনে চলতে হবে।
টাইমস: আগামীতে যদি বিএনপি ক্ষমতায় যায়, সেক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে কী ধরনের সর্ম্পক গড়ে তুলবে? মানে কীভাবে সম্পর্কটি দুই দেশের জন্য লাভজনক পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়া যায়?
আমির খসরু : এই যে বললাম তিনটা নীতি তাদের মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশের উচিত ভারতসহ সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সবসময় সুসম্পর্ক বজায় রাখার দিকে নজর দেওয়া। কিন্তু আপনারা জানেন যে, বাংলাদেশ থেকে ভারত শুধু নিতে চায়, বিনিময়ে তারা কিছুই দেয় না।
টাইমস: বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক জরুরি বলে আপনি মনে করেন কি?
আমির খসরু : আমি যে তিনটা নীতির কথা বললাম, সেটি ভারত-চীনসহ সব দেশের জন্য প্রযোজ্য।
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যেকটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিএনপির নীতি হবে মাল্টিল্যাটারালিজম বা বহুপাক্ষিতা। অর্থাৎ সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। যে দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ এবং দেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা হবে আমরা সেদিকেই থাকব। কারণ কোনো বিশেষ দেশের সঙ্গে একক সম্পর্কে আমরা বিশ্বাস করি না।
টাইমস : আপনি সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকবে বলছেন। যদিও দেখা যাচ্ছে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে আপনাদের তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। অন্যদিকে পাকিস্তান হাইকমিশনারের সঙ্গে কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। এর কারণ কী?
আমির খসরু : কারো সঙ্গে বেশি সুসম্পর্ক হয়েছে এরকম খবর আমার তো জানা নেই!
আগেই বলেছি যে, আমাদের সম্পর্ক বহুপাক্ষিকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিবেশী সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে বাংলাদেশের জনগণের ও দেশের স্বার্থ রক্ষা করা।
টাইমস: বিএনপি প্রথমে ডিসেম্বরে নির্বাচন চেয়েছিল, এখন ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন চায়। একটি রাজনৈতিক দল বলছে বিএনপি আবারও নির্বাচন পিছাতে চায়। এ বিষয়ে আপনার কিছু বলার আছে?
আমির খসরু: নির্বাচন নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন। কিন্তু নির্বাচন পেছানোর কথা আমরা বলছি না। আমরা নির্ধারিত সময় ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন চাই।
টাইমস: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নামে বর্তমানে কোনো মামলা চলমান নেই। তাহলে তিনি দেশে আসছেন না কেন? তিনি কবে নাগাদ দেশে ফিরতে পারেন?
আমির খসরু: তিনি যখন সঠিক সময় মনে করবেন তখনই দেশে আসবেন। বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য যেটা মঙ্গল হবে তিনি সেই সিদ্ধান্তই নেবেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলে আমরা সবাই তা জানতে পারব।
টাইমস: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তিনি এখন অসুস্থ এবং বাসায় আছেন। আগামীতে বিএনপি সরকার গঠন করলে তার অবস্থান কী হতে পারে?
আমির খসরু: তিনি তো অসুস্থ মানুষ, চিকিৎসা চলছে। তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরেছেন। তিনি কী ভূমিকা পালন করবেন সেটা নির্ভর করতে তার শারীরিক অবস্থার ওপর। এ মুহূর্তে সেটা নিয়ে কিছু বলা কঠিন।
টাইমস: আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ
আমির খসরু: আপনাদেরও ধন্যবাদ।


