রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতে পারে দলটি। এর মধ্য দিয়ে ৩৫ বছর পর দেশে প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পথ তৈরি হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। এর আগে দুপুর ১২টায় বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছে দলটি, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।
দলটি এখন পর্যন্ত তাদের প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়ে নীরব রয়েছে এবং বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষমতা দিয়েছে। তবে দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ফখরুলকেই মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি, যদিও নির্বাচন কমিশন থেকে দলটি দু’টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে।
ফখরুলের প্রার্থিতা নিয়ে জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হলে বৃহস্পতিবারই মন্ত্রী হিসেবে ফখরুলের শেষ কর্মদিবস হতে পারে বলে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের আলোচনায় উঠে এসেছে।
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যে অলি আহমদকে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ফলে সংসদে ভোট হওয়া নিশ্চিত হয়েছে।
১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি আগামী ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষে নির্বাচিত হবেন।
১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রার্থীরা ১৮ আগস্ট বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হবে। ভোটগ্রহণ শেষে একই কক্ষে ব্যালট গণনা করা হবে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) প্রাথমিক ফল ঘোষণা করবেন। পরে গেজেটের মাধ্যমে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে।
মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য উন্মুক্ত ব্যালটে ভোট দেবেন। প্রত্যেক ভোটারকে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নিজের পূর্ণ নাম লিখে ব্যালটে সই করতে হবে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে, বিএনপির মহাসচিব পদে তার উত্তরসূরি নিয়েও ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় নেতারা বলছেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। পরবর্তী দলীয় কাউন্সিলে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এ পদে থাকতে পারেন।
৩৫ বছর পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট
সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। সে সময় ক্ষমতাসীন বিএনপি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে এবং আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করেছিল। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আবদুর রহমান বিশ্বাস ৯২ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
এরপর থেকে সব রাষ্ট্রপতি নির্বাচনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছে। ১৯৯৬ সালে বিএনপি কোনো প্রার্থী না দেওয়ায় শাহাবুদ্দীন আহমদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
২০০১ সালে বিএনপি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে মনোনয়ন দেয় এবং তিনিও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। পরে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন। পরের বছর নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রার্থী করে। বিরোধী দলগুলো আবারও নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। আবদুল হামিদ ২০১৩ ও ২০১৮ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালে মো. সাহাবুদ্দিনও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
এবার বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় আনুষ্ঠানিক ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া আবারও ফিরছে।
ক্ষমতাসীন দলের ২৫৯টি আসনের বিপরীতে বিরোধী দলের আসন ৯০টি। ফলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর স্পষ্ট সংখ্যাগত সুবিধা রয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানগত বিধিনিষেধ থাকায় অপ্রত্যাশিত ফলাফলের সম্ভাবনাও কম।
প্রধান হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘উন্মুক্ত ব্যালট ব্যবস্থার কারণে কে কাকে ভোট দিয়েছেন, তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।’
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘সংসদ কক্ষে নিজ নিজ আসন থেকেই সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ব্যালট পেপার পৌঁছে দেবেন এবং ভোট দেওয়ার পর সংসদ সদস্যরা তিনটি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের যেকোনো একটিতে ব্যালট জমা দেবেন।’
ভোটগ্রহণ বিকাল ৫টায় শেষ হওয়ার পরপরই চার থেকে পাঁচ সদস্যের একটি দল ব্যালট গণনা করবে। সিইসি বৈধ ও অবৈধ ভোটের সংখ্যা এবং প্রত্যেক প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ঘোষণা করবেন।
ব্যালট পেপারে দু’টি অংশ থাকবে। এক অংশে ভোটারের পরিচয় ও স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত স্থান থাকবে এবং অন্য অংশে প্রার্থীদের নাম থাকবে। ভোটারদের পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নিজেদের পূর্ণ নাম লিখে সই করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের ২০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োজিত থাকবেন এবং নির্বাচন কমিশনাররা পুরো প্রক্রিয়া তদারক করবেন। নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় সংসদ সচিবালয় যৌথভাবে নির্বাচনের আয়োজন সমন্বয় করবে।
গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে ভোটগ্রহণ ও ভোট গণনা অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ থেকে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাও থাকবে।
দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


