বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাতরত বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিতের নামে নির্বাচন কমিশন এবং এর আইডিইএ প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) কর্মকর্তারা ব্যাপক বিদেশ সফর করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। খোদ নির্বাচন কমিশনেরই অনেক কর্মকর্তা এসব সফর নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
প্রবাসীদের নিবন্ধন ও এ সংক্রান্ত নানা কাজের দোহাই দিয়ে এরই মধ্যে কমিশনের বহু কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। আর স্বাভাবিকভাবেই তাদের সরকারি এসব সফরে ব্যয় হওয়া অর্থ এসেছে দেশের সাধারণ মানুষের দেওয়া কর থেকে।
ইসির নথি ঘেঁটে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইসির কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর চলছেই। এরই মধ্যে নতুন সফরের জন্য গন্তব্যস্থল এবং কর্মকর্তাদের নামের তালিকা করা হচ্ছে।
যার মধ্যে চলতি মাসেই ২০ কর্মকর্তার একটি বড় দলের ১০ দিনের সফরে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা রয়েছে। ইসির নথি থেকে জানা গেছে, এরপরের তালিকায় রয়েছে মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, জর্ডান, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ওমান। সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে ইসির অন্তত ২৬ কর্মকর্তা এসব দেশ সফর করবেন।
তবে, এখন পর্যন্ত এসব সফরের অর্জন খুবই নগণ্য। গত দুই বছরে ২৮ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশিকে ভোটার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র ১১ হাজার ৬৩৩ জনকে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই বিদেশ সফরকে যুক্তিযুক্ত বললেও, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই বিপুল সংখ্যক সফরকে অস্বাভাবিক বলে আখ্যা দিয়েছে। সেইসঙ্গে এসব ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখতেও আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিলাসবহুল আয়োজন
নিবন্ধনের কাজের জন্য আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিস স্ক্যান করতে মাত্র এক বা দুজন কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি প্রয়োজন। তারাই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে এবং অন্যদের সেগুলো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে পারেন। আর এই কাজের উদ্বোধন করারও কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।
তবে এরপরেও প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন, নিবন্ধন কাজের উদ্বোধনের নামে ইসির কর্মকর্তারা বিদেশ সফরে যাচ্ছেন। এ মুহূর্তে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন কানাডায় রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহর আগামী মাসে সুইডেন সফরের কথা রয়েছে।
চলতি মাসে যে ২০ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা, তারা মিয়ামি, লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্ক সিটি ও ওয়াশিংটন ডিসিতে ভ্রমণ করবেন। এর আগে গত এপ্রিলে, ইসি’র তিন শীর্ষ কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সফর করেন।
ইসির নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের নামে দুই বছরে ১৬০ জনের বেশি কর্মকর্তা ১৮০ বারের বেশি বিদেশ সফর করেছেন। মূলত সিঙ্গাপুর, ইতালি, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েত সফরে গিয়েছেন তারা।

অক্টোবরে কর্মকর্তাদের ছয়টি আলাদা দলের জর্ডান, মালদ্বীপ, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওমান সফরের কথা রয়েছে। প্রত্যেক দলে থাকবেন ছয় কর্মকর্তা। এছাড়াও, নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকারসহ দুজন কর্মকর্তার এ মাসে মালয়েশিয়া সফরের কথা রয়েছে।
ইসির নথি অনুযায়ী, আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাক্সেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্পের কর্মকর্তারাই সবচেয়ে বেশি বিদেশ সফর করেছেন। এরপরেই রয়েছেন ইসি’র আইসিটি উইং এবং জাতীয় পরিচয়পত্র বিভাগের কর্মকর্তারা।
প্রতি সফরেই কারিগরি কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, বিষয়টি যুক্তিযুক্তও। কিন্তু প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের কেন সফরে পাঠানো হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, অনেক নির্বাচন কমিশনার বিভিন্ন দেশে ভোটার নিবন্ধনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য ভ্রমণ করেছেন। এসব ফরকেও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন অনেক কর্মকর্তা।
আবার সরাসরি ভোটার নিবন্ধনের কাজে জড়িত উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা খুব কমই বিদেশ সফরের সুযোগ পান। অথচ প্রবাসীদের তথ্য সংগ্রহ ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জন্য তারাই সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও উপযুক্ত। কিন্তু তাদের বদলে বিদেশ সফরে যান শীর্ষ কর্মকর্তারা।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ুন কবির, ইসির সিনিয়র সচিব আক্তার আহমেদ, অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ এবং আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার কথা। যারা একাধিকবার বিদেশ সফর করেছেন।
তাদের এই সফর দেখে মনে হতেই পারে যে, আইডিইএ প্রকল্পের তহবিলের টাকায় ইসি কর্মকর্তারা ভ্রমণ বিলাসিতায় মেতেছেন।
ভ্রমণের খরচ
কমিশনের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের এই বিপুল খরচের তথ্য গোপনের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইডিইএ প্রকল্পের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রত্যেক কর্মকর্তার গড় ভ্রমণ খরচ ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে এই অংক আরও অনেক বেশি। সবমিলিয়ে গত দুই বছরে বিদেশ ভ্রমণের মোট খরচ প্রায় ১৫ কোটি টাকা হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইডিইএ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী তার দপ্তরের এক কর্মচারীকে বিদেশ সফরের ব্যয় সংক্রান্ত তথ্যের জন্য প্রবাসী শাখায় খোঁজ নিতে বলেন।
তবে প্রবাসী শাখার পরিচালক খান আবি শাহানুর খান বলেন, ‘আমাদের কাছে খরচের হিসাব নেই। এটা প্রকল্পের টাকা। এ বিষয়ে প্রকল্পের কর্মকর্তারাই বলতে পারবেন।’
টাইমস অব বাংলাদেশ এনআইডি শাখা এবং আইডিইএ প্রকল্পের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে খরচের বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করলেও তারা কেউ এ বিষয়ে মুখ খোলেননি।
বিরাট আয়োজনের নগন্য ফলাফল
বিপুল খরচের ও ব্যাপক আয়োজনের এসব বিদেশ সফরের ফলাফল অতি নগণ্য। কারণ এত খরচ করে খুব কম সংখ্যক প্রবাসী ভোটারকে নিবন্ধিত করা গেছে এবং এনআইডি কার্ড দেওয়া গেছে।
২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের ১০টি দেশের ৫০ হাজারের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশী ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন।
সবচেয়ে বেশি আবেদন এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। আবেদনকারীদের মধ্যে মাত্র ২৮ হাজার জনকে নিবন্ধনের আওতায় আনা গেছে এবং ১০টি দেশের ১৭টি কেন্দ্রের মাধ্যমে ১১ হাজার ৬৩৩ জন প্রবাসীকে এনআইডি কার্ড দেওয়া হয়েছে।
আর এত অল্প সংখ্যক মানুষের নাম নিবন্ধন ইসি বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে। এনআইডি শাখার মহাপরিচালক মতে, আরও বেশি প্রবাসীকে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত করার জন্য আরও কয়েকটি দেশে এই কর্মসূচি চালু করা হবে।
যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং অন্যদের প্রশিক্ষণের জন্য এত বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠানোর যৌক্তিকতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অনেক কর্মকর্তাই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর অপ্রয়োজনীয় বলেও মনে করেন।
ইসির একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এসব কাজের বেশিরভাগই বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন বা অনলাইনের মাধ্যমে করা যেত। প্রবাসীরা অনলাইনে তাদের আবেদন জমা দেওয়ার পর উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা সেগুলো যাচাই-বাছাই করেন। যেহেতু উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা নিবন্ধন সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তাই তাদেরকেই বিদেশে পাঠানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। কিন্তু তাদের পরিবর্তে পাঠানো হচ্ছে শীর্ষ কর্মকর্তা ও প্রকল্প কর্মকর্তাদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘যেহেতু সফরকারী কর্মকর্তাদের তেমন কিছুই করার থাকে না, তাই জনগণের টাকায় এই বিদেশ সফরগুলো তাদের জন্য পিকনিকের মতো হয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ুন কবির টাইমসকে বলেন, ‘বাংলাদেশী দূতাবাস ও হাইকমিশনের মাধ্যমে এনআইডি সেবা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রে ২০ জন কর্মকর্তা পাঠানো অতিরিক্ত ছিল কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এর যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে লোক পাঠানো হচ্ছে। শুধুমাত্র কাজের জন্য অপরিহার্য ব্যক্তিদেরই পাঠানো হচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রে ১২ লাখেরও বেশি প্রবাসী বাস করেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এদের মধ্যে কতজনকে ভোটার করা হবে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই।’
দূতাবাস ও হাইকমিশনের মাধ্যমে নিবন্ধন প্রক্রিয়া পরিচালনার যুক্তির বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে অনুমোদন পর্যন্ত সবকিছু তারাই করবে। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা শুধু সেগুলো যাচাই করবেন।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ইসির কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের পরিসংখ্যানকে অস্বাভাবিক বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের সুযোগ দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
এ ধরনের ব্যাপক বিদেশ সফরের প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখার ওপরও জোর দেন তিনি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘মানুষ আশা করে যে, ইসির মতো একটি সাংবিধানিক সংস্থা নৈতিক আচরণ ও সততার চর্চা করবে। তাদের কার্যক্রমে ভ্রমণ বিলাসিতার কোনো উপাদান পাওয়া গেলে, জনগণ সংস্থাটির দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।’


