ফেনীতে আবারও তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। বুধবার দুপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির কারণে জেলার প্রায় সব সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতেও গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়ায় রান্নাবান্না বন্ধ রয়েছে অনেক এলাকায়।
হঠাৎ করে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহক, সিএনজি অটোরিকশাচালক, গণপরিবহন শ্রমিকসহ শিল্পকারখানার সংশ্লিষ্টরা। বিকল্প হিসেবে অনেকে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে ছুটছেন। এতে স্থানীয় বাজারে এলপিজির দামও বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল) ফেনী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রতিদিন প্রায় ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে।
শুধু ফেনী জেলাতেই বিজিডিসিএলের প্রায় ২৫ হাজার আবাসিক গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে ফেনী শহরেই রয়েছেন প্রায় ১৯ হাজার গ্রাহক। এ ছাড়া জেলায় ১২টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন, প্রায় ২৯টি শিল্পকারখানা এবং সাতটির মতো ক্যাপটিভ পাওয়ার ইউনিট রয়েছে। গ্যাসের তীব্র সংকটে এসব প্রতিষ্ঠানও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
রান্নাবান্না বন্ধ, বেড়েছে এলপিজির দাম
বুধবার দুপুরের পর থেকেই ফেনী শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ির চুলায় গ্যাসের চাপ কমতে কমতে একপর্যায়ে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দুপুর ও রাতের রান্না নিয়ে বিপাকে পড়েন আবাসিক গ্রাহকেরা।
নাজির রোড এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, ‘আগে গ্যাসের চাপ কম থাকলেও কোনোভাবে রান্না করা যেত। কিন্তু বুধবার দুপুর থেকে একেবারেই গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে রান্নার জন্য এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণত ১ হাজার ৬০০ টাকার আশপাশে যে এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায়, সংকটের সুযোগ নিয়ে কোথাও কোথাও তা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
দাউদপুর এলাকার বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বলেন, ‘গ্যাস না পেলেও মাস শেষে বিল দিতে হবে। দীর্ঘ সময় সরবরাহ বন্ধ থাকলে গ্রাহকদের গ্যাস বিল স্থগিত বা মওকুফের ব্যবস্থা করা উচিত।’
ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সিএনজি চালিত যানবাহনে। ফেনীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কোথাও কোথাও স্টেশনের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
নজির আহমেদ ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমান সিএনজি অটোরিকশাচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গাড়ি চালাতে পারছেন না। গাড়ি না চালালে মালিকের জমা টাকা দেওয়া এবং সংসারের খরচ চালানো দুটোই কঠিন হয়ে পড়বে।
আরেক চালক আবদুল খালেক বলেন, ‘সকাল থেকে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছি। গ্যাস না পেয়ে শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। এভাবে কয়েক দিন চললে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।’
ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস না থাকায় সিএনজি অটোরিকশা ও গণপরিবহনের সংখ্যা কমে গেছে। এতে যাত্রীদেরও ভোগান্তি বেড়েছে। কিছু এলাকায় সীমিত সংখ্যক যানবাহন চলাচল করায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
রবিউল ইসলাম নামে এক যাত্রী বলেন, গাড়ি কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে বাড়তি ভাড়া দিয়েই গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।
দুপুর থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ
স্টার লাইন ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার বিপুল শর্মা জানান, তাদের তিনটি স্টেশনে প্রতিদিন ১১ থেকে ১২ হাজার ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বুধবার দুপুর থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ফিলিং স্টেশনগুলো চালু রাখা সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।’
কারিগরি ত্রুটিতে এলএনজি সরবরাহ কমেছে
বিজিডিসিএল কর্তৃপক্ষের জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এলএনজি টার্মিনালের ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় পর্যায়ে এলএনজি সরবরাহ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কমে গেছে।
এর প্রভাবে বিজিডিসিএলের আওতাধীন কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় চাপ শূন্যের পর্যায়ে নেমে গিয়ে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে সাময়িক এ অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে বিজিডিসিএল।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ফেনী কার্যালয়ের বিক্রয় শাখার ব্যবস্থাপক কিরণ শংকর পাল বলেন, ‘জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস না আসায় ফিলিং স্টেশনসহ প্রায় সব শ্রেণির গ্রাহকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সরবরাহ অব্যাহত থাকায় কিছু এলাকায় অতি সীমিত পরিসরে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
সংস্থাটির সঞ্চালন বিভাগের ব্যবস্থাপক দেওয়ান মোস্তফা ইমরান বলেন, ‘মূলত এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এটি জাতীয় পর্যায়ের সংকট। জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার নির্দিষ্ট সময় বলা যাচ্ছে না।’
এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফের সংকট
এর আগে, গত সপ্তাহেও টানা ছয় দিন ফেনীতে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছিল। সেই সংকট কাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর এক সপ্তাহ না যেতেই বুধবার আবারও দ্বিতীয় দফায় তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
ফলে একদিকে বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকায় পরিবহন খাতেও তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গ্যাসনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্রাহকদের দাবি, জাতীয় পর্যায়ের এ সংকট দ্রুত সমাধান করে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যথায় বারবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে আবাসিক গ্রাহক থেকে শুরু করে পরিবহন ও শিল্পখাত–সব ক্ষেত্রেই ভোগান্তি আরও বাড়বে।


