বুড়িগঙ্গা নদীর মোট দূষণের ৮০ শতাংশই হচ্ছে শিল্প ও জৈব বর্জ্য থেকে। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ দূষণ ঘটছে শিল্পবর্জ্য, রং, রাসায়নিক বর্জ্য ও ভারী ধাতুর কারণে। আর ২৫ শতাংশ আসছে জৈব বর্জ্য, রোগজীবাণু ও অ্যামোনিয়া থেকে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে ‘ঢাকার চারপাশের তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদী এবং নদী সংযুক্ত খালসমূহ থেকে পতিত বর্জ্যের কারণে সৃষ্ট নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণকল্পে শিল্প মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায়’ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সভায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও ধলেশ্বরী নদীর বর্তমান দূষণ পরিস্থিতি ও তা নিয়ন্ত্রণে করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় মুল প্রবন্ধ তুলে ধরেন রিয়ার অ্যাডমিরাল মাসুদ ইকবাল । সেখানে উঠে আসে শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য ও প্লাস্টিক তুরাগ নদীর প্রধান দূষক। এসব দূষণের কারণে নদীটির পরিবেশগত অবস্থা সংকটাপন্ন।
অন্যদিকে ট্যানারি, শিল্প ও বাজারের বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, তেল ও কালো স্লাজের দূষণে বুড়িগঙ্গার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। শিল্পবর্জ্য, ভারী ধাতু ও জীবাণু দূষণের কারণে ধলেশ্বরীও রয়েছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়।
বুড়িগঙ্গার পানির গুণগত মানেও দূষণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৬৮ মিলিগ্রাম/লিটার। পরিবেশগতভাবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রা কমপক্ষে ৫ মিলিগ্রাম/লিটার। ফলে নদীর পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি জলজ প্রাণী ও স্বাভাবিক জলজ প্রতিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।
নদীর পানিতে জৈব অক্সিজেন চাহিদা পাওয়া গেছে ১০ দশমিক ৬৭ থেকে ১৩ মিলিগ্রাম/লিটার। অথচ কাঙ্ক্ষিত মাত্রা ৩ মিলিগ্রাম/লিটারের নিচে। রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা পাওয়া গেছে ৩১ দশমিক ৫৬ থেকে ৫৩ দশমিক ৪৪ মিলিগ্রাম/লিটার, যেখানে কাঙ্ক্ষিত সর্বোচ্চ মাত্রা ৫ মিলিগ্রাম/লিটার।
বুড়িগঙ্গার পাশাপাশি তুরাগ ও ধলেশ্বরীতেও শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, প্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর দূষণ নদীর পরিবেশগত অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে। নদী দখল, তীর ভরাট, পলি জমা এবং সংযুক্ত খালগুলো সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দূষিত পানি দ্রুত সরে যেতে পারছে না।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, দেশের সম্পদ সৃষ্টির দায়িত্ব যেমন ব্যবসায়ীদের, তেমনি পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। দেশের উন্নয়নে দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, নদী ও পরিবেশ রক্ষায় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। যেসব শিল্পকারখানায় বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) নেই, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইভাবে ইটিপি থাকলেও যেসব প্রতিষ্ঠান তা যথাযথভাবে পরিচালনা করছে না, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু নদীর মূল অংশ পরিষ্কার করলে হবে না। কোথা থেকে দূষিত বর্জ্য নদীতে প্রবেশ করছে, সেই উৎস চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সভায় শিল্প উদ্যোক্তারা নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে ইটিপি পরিচালনার পাশাপাশি বর্জ্য পরিশোধনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা (সিইটিপি) স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, শুধু প্রতিটি কারখানায় ইটিপি স্থাপন করলেই হবে না, সেগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামোও গড়ে তুলতে হবে।
আলোচনায় বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি ও শিল্পকারখানার মালিকরা অংশ নেন। তারা শিল্প খাতে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের সহযোগিতার ঘাটতি এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেন।
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ইটিপিসহ পরিবেশ সুরক্ষায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম ও পণ্যের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরও দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
সভায় বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও অন্যান্য অংশীজনের প্রতিনিধিরাও বক্তব্য দেন। তারা বলেন, শুধু নদী থেকে বর্জ্য অপসারণ করলেই দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; দূষণের উৎস বন্ধ করতে হবে।


