ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট। ঠিক সে সময় রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। কয়েক সেকেন্ডের ভূমিকম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। জীবন বাঁচাতে নিরাপদ স্থানে ছুটতে থাকেন তারা। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে ছিলেন পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ হলগুলোর আবাসিক শিক্ষার্থীরা। দৌড়াদৌড়ির মধ্যে কারও পা মচকে যায়, কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বহুতল ভবন থেকে লাফ দেন। এতে আহত হন অনেক শিক্ষার্থী।
শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. মর্তুজা মেডিকেল সেন্টারের হিসাব বলছে, ভর্তি ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে চিকিৎসা নেন অন্তত ১৫ জন। গুরুতর কয়েকজনকে পাঠানো হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে।
মহসিন হলের চারতলা থেকে লাফ দেওয়া আহত এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ভূমিকম্প টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বের হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হলের এত বাজে অবস্থা, তাই মনে হয়েছিল নিচে পৌঁছানোর আগে কিছু একটা মাথায় পড়বে। তাই লাফ দেওয়া ছাড়া উপায় দেখিনি।’
তিনি জানান, তাদের হলটি খুব পুরোনো। মাঝেমধ্যে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে।

এই ভয়-আতঙ্কের কেন্দ্রে আছে ঢাবির আবাসিক হলগুলোর ভঙ্গুর ও জীর্ণ অবস্থা। মানসম্মত আবাসন ও উন্নত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষ পেরিয়েও সে মানে পৌঁছাতে পারেনি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বঞ্চিত মানসম্মত আবাসন থেকে। যারা হলে থাকার সুযোগ পেয়েছেন, তারাও থাকছেন ‘পুরাতন’ ও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ভবনে।
ঢাবির অধিকাংশ হল নির্মিত দেশের স্বাধীনতার আগে। বহু বছর ধরে সংস্কার না হওয়ায় দেয়াল-ছাদে ফাটল ও পলেস্তারা খসে পড়া নিয়মিত ঘটনা। কোথাও ফাটল ধরে রড বেরিয়ে এসেছে, কোথাও ছাদের টুকরো পড়ছে। রং বা সিমেন্টের পাতলা প্রলেপ দিয়ে সাময়িকভাবে ঢাকার চেষ্টা হলেও কাঠামোগত দুর্বলতা থেকেই যাচ্ছে, অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
ভবনগুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, মহসিন হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, জসীমউদ্দীন হল, সূর্যসেন হলসহ আরও কয়েকটি হলে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত বাধ্য হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে থাকতে।

বুধবার শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ৩৪৯ নম্বর কক্ষে ঘটে আরেকটি আতঙ্কজনক ঘটনা। হঠাৎ করে ছাদ থেকে বড় একটি পলেস্তারা খসে পড়ে। রুমে থাকা শিক্ষার্থী সৈয়দ জাহেদ ইকবাল বলেন, ‘অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। যেদিকে পলেস্তারা পড়েছে, দুই সেকেন্ড আগে সেখানে আমি দাঁড়িয়েছিলাম।’
একই হলের ২০১ নম্বর রুমে দুই মাস আগে ছাদ থেকে একইভাবে পলেস্তারা খসে পড়ে। হল প্রশাসনকে জানানো হলেও সংস্কারের আশ্বাসের বাইরে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থীরা।
অপরদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ২০৪ নম্বর রুমে গত ৭ জানুয়ারি ছাদের পলেস্তারা খসে এক শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পর জরুরি পরিস্থিতিতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে হল প্রশাসন। তবে মেরামত কাজ শুরু হলেও তা ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে কর্মচারীদের অবহেলার কারণে।

হলের প্রাধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু কর্মচারীর অবহেলার কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে আমি আমার একাডেমিক কাজ বাদ দিয়ে এগুলো যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি।’
তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের বাইরে থেকেও প্রকৌশলী নিয়োগ করা হয়েছে।
এক মাস আগে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ১৪২ নম্বর কক্ষে ছাদ থেকে খসে পড়া পলেস্তারা গিয়ে পড়ে এক শিক্ষার্থীর বালিশে। সে সময় ‘সৌভাগ্যক্রমে’ তিনি রুমে ছিলেন না।

হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক সাদমান আবদুল্লাহ বলেন, ‘এই হলের বেশিরভাগ রুম একই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
হল প্রাধ্যক্ষ আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, এ বছর বার্ষিক বাজেটে হল মেরামতের জন্য বরাদ্দ না থাকায় কাজ শুরু করতে পারছেন না তারা। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা মৃত্যু ঝুঁকিতে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অনুরোধ–যত দ্রুত সম্ভব প্রাথমিক কাজ শুরু করার মতো বাজেট যেন দেওয়া হয়।’
হল সংস্কার প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. আক্রাম হোসেন জানান, পুরান হলগুলো মেরামতের জন্য ‘বড় অঙ্কের বাজেট’ প্রয়োজন। মেরামতের জন্য কয়েকটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হলেও সরকার থেকে বাজেট অনুমোদন না পাওয়ায় কাজ শুরু করা যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

তবে যেসব ভবন ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থায় আছে, সেগুলোতে ইতোমধ্যে প্রাথমিক মেরামতের শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ঢাবির ইতিহাসে প্রশাসনের উদাসীনতার ভয়াবহ প্রভাবের একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে জগন্নাথ হলে ছাদ ধসে ৩৯ জন শিক্ষার্থী ও কর্মচারী প্রাণ হারান। সেই ‘ট্র্যাজেডি’ স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রতি বছর দিনটিকে ‘শোক দিবস’ হিসেবে পালন করে।
তবে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক হল এখনো পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। শিক্ষার্থীরা আশঙ্কা, যথাযথ সংস্কার না হলে যেকোনো সময়ে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা সতর্ক করেন, ‘পুরোনো এবং ভঙ্গুর অবকাঠামোর কারণে আমরা প্রতিদিন ঝুঁকির মধ্যে আছি। দ্রুত সংস্কার না হলে বিপদ এড়িয়ে চলা কঠিন হবে।’


