ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের নামে ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়েছে যার বেশিরভাগই পাচার হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন পরিস্থিতিতে আসছি যখন ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়ে গেছে। ব্যাংকিং সিস্টেমের এক তৃতীয়াংশ টাকাই নেই, যেটাকে আমরা ভদ্র ভাষায় খেলাপি ঋণ বলছি। এর অংশ চুরি হয়ে গেছে, এর বিপরীতে কোনো জামানত নাই।
‘স্থবির অর্থনীতি চাঙা’ করা ও বন্ধ কারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেন গভর্নর।
এই ঋণ প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকে থাকা অতিরিক্ত তারল্য থেকে ও অবশিষ্ট ১৯ হাজার কোটি টাকার তহবিল দিবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজের আয় থেকে।
শনিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম মিলনায়তনে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকা অর্থনীতি সক্রিয় করতে ও ২০ হাজার কোটি টাকা থাকবে বন্ধ কারখানার জন্য।
ঋণ সুদহার ও বড় এই অঙ্কের ঋণ প্যাকেজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে গভর্নর বলেন, ‘এ বিষয়ে বিস্তারিত সার্কুলার দেওয়া হবে। তখন জানতে পারবেন।’
খেলাপি হয়ে পড়া ও পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ উদ্ধারে কাজ করছেন জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘যে ১০০ টাকা নিয়েছে, তার কাছে কিন্তু একশত টাকা নাই। আমরা এখন কাজ করছি এই টাকা কীভাবে আদায় করা যায়।’
এর আগে একক গ্রাহক ঋণ সীমা বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করতে ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে বিশাল অঙ্কের ঋণ সুবিধা বাড়ানোতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে কি না–এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজারটা কোথায় তা আপনারা জানেন। সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা টাকার মান কমে গেছে ৪০ শতাংশেরে মতো। আমদানি করা কাচামালের দর বেড়ে গেছে। এতে বড় গ্রাহকদের ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে।’
‘এ কারণে আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে তার (গ্রাহকের) সীমা বাড়ানো দরকার। এর মানে এই না যে ব্যাংক ঋন দিয়ে দিবে। আমরা প্রত্যাশা করি ব্যাংক ভালো গ্রাহককে ঋণ দিবে।’
গভর্নর বলেন, ‘এই ঋণে সরকার ৬ শতাংশ হারে সুদ ভর্তুকি দিবে সরকার। এখানে অতিরিক্ত কোনো টাকা ছাপানো হবে না। এটা ব্যাংকিং খাতের টাকা, ব্যাংক থেকেই দেওয়া হবে। কিছু ব্যাংকের অতিরিক্তি তারল্য আছে, তা ঋণ দিয়ে আবার ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা হবে।’
অতীতে এমন বড় ঋণ প্যাকেজের অর্থ বেহাত হয়ে গেছে, এই অর্থ তছরূপ রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করবো, ফাঁকফোঁকর যেনো ঠিক করা হয় তা সার্কুলারের মাধ্যমে জানানো হবে।’
বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ৫ শতাংশের নিচে নেমেছে। অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এখন ঋণ প্যাকেজ না দেওয়া ছাড়া উপায় নেই বলে মনে করেন গভর্নর।
তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের হাতে চলতি মূলধন ড্রাই হয়ে গেছে। তাদের কাছে টাকা নেই। অর্থনীতি যে অবস্থায় আছে, এই মুহূর্তে এটা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো চয়েস নেই। ইকোনোমি বুস্ট করার জন্য করতে হয়েছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া লিখিত সার সংক্ষেপের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন খাতওয়ারি ঋণ বরাদ্দ দিতে হবে ব্যাংকগুলোকে।
পুণঃঅর্থায়ন তহবিলের ৪১ হাজার কোটি টাকার তহবিলের মধ্যে বন্ধ কারখানা ও সেবা খাতে ঋণ যাবে ২০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমইতে ৫ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ১০ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বৈচিত্রকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা ও উত্তর বঙ্গে কৃষি অর্থায়নে ৩ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে ১৯ হাজার কোটি টাকার বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে ঋণ যাবে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যন্স খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, কটেজ ও মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রি খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, চামড়াজাত পণ্য ও জুতা রপ্তানি খাতে ২ হাজার কোটি টাকা, যুব কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা, গ্রামীণ অর্থনীতি খাতে ১ হাজার কোটি টাকা, হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি খাতে ২ হাজার কোটি টাকা, সবুজ অর্থায়নে ১ হাজার কোটি টাকা, বৈদেশিক কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা, স্টার্টআপ ৫০০ কোটি টাকা ও উদ্ভাবনি অর্থনীতিতে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ বরাদ্দ দেওয়া হবে।


