নওগাঁয় কাঁচা মরিচের ঝাঁজ, চাপে সাধারণ ক্রেতারা

নওগাঁয় কাঁচা মরিচের ঝাঁজ, চাপে সাধারণ ক্রেতারা
কাঁচা মরিচ। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে নওগাঁর কাঁচা মরিচের বাজার বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। একসময় যে মরিচ প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হতো, সেটিই এখন পাইকারি বাজারে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর খুচরা বাজারে ক্রেতারা তা কিনছেন ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে। আকস্মিক এই মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষকরা ভালো দাম পেয়ে সন্তুষ্ট হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যের বাড়তি দামে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অতিবৃষ্টিতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে মরিচের সরবরাহ কমেছে, যা মরিচের বর্তমান দামে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে কাঁচা মরিচের আবাদ হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেশি, সাদা ও আকাশি জাতের মরিচের চাষ করা হচ্ছে। তবে চলমান বর্ষা মৌসুমে টানা বৃষ্টির কারণে প্রায় ১০ হেক্টর জমির মরিচক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে নিচু জমিতে পানি জমে থাকায় অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

নওগাঁ সদর উপজেলায় কীর্তিপুরের সাপ্তাহিক হাট এখানকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচা মরিচের বাজার। প্রতি মঙ্গল ও শুক্রবার ভোর থেকেই কৃষকরা মাঠ থেকে তোলা টাটকা মরিচ নিয়ে এই হাটে আসেন। এখানে সূর্য ওঠার আগেই জমে ওঠে বেচাকেনা, আর সকাল ৮টার মধ্যেই অধিকাংশ মরিচ বিক্রি শেষ হয়ে যায়। কীর্তিপুর, বর্ষাইল ও বক্তারপুর ইউনিয়নের পাশাপাশি পাশের বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের শতাধিক কৃষক এই হাটে মরিচ বিক্রি করতে আসেন।

কাঁচা মরিচের কেনাবেচা চলছে। ছবি: টাইমস

বর্তমানে এই হাটে জাতভেদে প্রতি কেজি মরিচ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও একই মরিচের দাম ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। পরে ধাপে ধাপে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা এবং বর্তমানে ২০০ টাকার গণ্ডি পেরিয়ে ২৫০ টাকায় পৌঁছেছে এই দাম। দাম বাড়ার পরও প্রতি হাটবারে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মরিচের বেচাকেনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

জেলার সবচেয়ে বড় পাইকারি কাঁচা মরিচের বাজার মহাদেবপুর উপজেলার মোমিনপুর হাটেও এখন একই চিত্র। এই হাটে বছরে প্রায় ছয় থেকে সাত মাস মরিচের বেচাকেনা চলে। প্রতি মাসে প্রায় তিন কোটি টাকার কাঁচা মরিচ কেনাবেচা হয়। বর্তমানে প্রতিটি হাটবারে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকার মরিচের কেনাবেচা হচ্ছে। এখান থেকে নওগাঁ ছাড়াও রাজশাহী, বগুড়া, নাটোর, জয়পুরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মরিচ সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামের বাজারেও নিয়মিত এখানকার মরিচ পাঠানো হয়।

আরও পড়ুন

পাইকারি ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘চট্টগ্রামে সাদা মরিচের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমরা তিনজন ব্যবসায়ী মিলে প্রতি সপ্তাহে একটি ট্রাকে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার মরিচ চট্টগ্রামে পাঠাই। কিন্তু বর্তমানে হাটে সরবরাহ কম থাকায় বেশি দামে মরিচ কিনতে হচ্ছে। ফলে পাইকারি দামও বেড়ে গেছে।’

কৃষকদের দাবি, অতিবৃষ্টিই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। নিচু এলাকার অনেক মরিচক্ষেত কয়েক দিন পানির নিচে থাকায় গাছ নষ্ট হয়েছে। নতুন গাছে ফলনও প্রত্যাশার তুলনায় কম এসেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে মরিচের জোগান কমেছে, আর সেই সুযোগে দামও বেড়েছে।

বাজারের একজন বিক্রেতা। ছবি: টাইমস

সদর উপজেলার আতিতা গ্রামের কৃষক আনিছুর রহমান বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে মরিচের আবাদ করেছি। নতুন গাছ থেকে দুই সপ্তাহ ধরে অল্প পরিমাণ মরিচ তুলেছি। আজ ২২ কেজি মরিচ ২৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি। সপ্তাহে দুই দিন মরিচ তোলা হচ্ছে। এবার দাম ভালো থাকায় কিছুটা লাভ হচ্ছে। তবে উৎপাদন বাড়লে বাজারে সরবরাহও বাড়বে, তখন দাম কমে আসবে।

ভালো দাম পেলেও কৃষকদের অনেকেই বলছেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না। অনেক ক্ষেতেই ফলন স্বাভাবিক থাকলে কম দামেও মোট বিক্রি বেশি হতো। ফলে বর্তমান উচ্চমূল্য ক্ষতির পুরোটা পুষিয়ে দিতে পারছে না।

অন্যদিকে বাজারে মরিচ কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। সদর উপজেলার উকিলপাড়া মহল্লার বাসিন্দা সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘মরিচের দাম শুনেই অবাক হতে হয়। আগে আধা কেজি কিনতাম, এখন ১০০ গ্রাম কিনতে হচ্ছে। শুধু মরিচ নয়, প্রায় সব ধরনের সবজির দামই অনেক বেশি। সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে কাঁচা মরিচের দাম কৃষকদের জন্য ইতিবাচক। তবে অতিবৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আরও আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরী সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad