পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিক্ষোভ-আন্দোলনের পরও সিদ্ধান্তে বদল না আসায় শেষ পর্যন্ত আদালতের দারস্থ হয়েছেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৭ জুলাই। সেদিন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২০২৫ সালের পঞ্চম শ্রেণির সরকারি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে কেবল দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিটিআই-সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয় ও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়-সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
দেশে একসময় প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করার পর মেধা বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হতো। সেখানে মেধাতালিকায় থাকা শিক্ষার্থীরা পেত মাসিক বৃত্তি। তবে ২০০৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা (পিইসিই) চালু হলে সেবছর থেকে বন্ধ হয়ে যায় বৃত্তি পরীক্ষা।
এরপর ২০২২ সালে আবার চালু হয় প্রাথমিকে বৃত্তি, সেবার সরকারি-বেসরকারি সবাই এই পরীক্ষা দেয়। যদিও ২০২৩ ও ২৪ সালে আর পরীক্ষা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর আবারও বৃত্তি পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এবার কেবল সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
বৃত্তি পরীক্ষায় বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় দেশজুড়ে শুরু হয় বিতর্ক। সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দেশজুড়ে আন্দোলনে নামেন বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা।
তখন মন্ত্রণালয় থেকে কিছু ‘যুক্তি’ দিয়ে একটি বিবৃতি দেওয়া হলেও, সেগুলোকে ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখান করেছেন বেসরকারি স্কুল সংশ্লিষ্টরা। সরকারের সিদ্ধান্ত বদলের দাবিতে আদালতের দারস্থ হন তারা।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের বিপরীতে একটি রিট করেছিলেন বিক্ষুব্ধরা। সেই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে প্রজ্ঞাপনের ওপর দুই মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছে আদালত। এখন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন আপিল করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি হিসেবে, দেশে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৩০টি। এরমধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭টি। এসব প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তির আওতায় এনেছে সরকার। এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি সব মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৫ জন।
অন্যদিকে দেশের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংগঠন বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটির অধিক।
সংগঠনটির মহাসচিব মো. রেজাউল হক বলছেন, ‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পঞ্চম শ্রেণির সরকারি বৃত্তি পরীক্ষা দিতে না পারলে, দেশের অর্ধেক সংখ্যক শিক্ষার্থীর প্রতি অবিচার করা হবে। জীবনের শুরুতেই এই শিশুরা তাহলে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার হবে।’
তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়ার মান অনেক ভালো। সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনায় নিজেদের অদক্ষতা ও দূর্বলতা ঢাকতেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতি খড়্গহস্ত হয়েছে মন্ত্রণালয়।’
তবে এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আরেকজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা জীবনের শুরুতেই অগ্রসরমান সমাজের শিশুদের বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হচ্ছে। বিজ্ঞাপন দিয়ে বা বিভিন্ন কৌশলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই কাজটি করছে। সমাজের অগ্রসর অংশের ওই শিশুরা সরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়লেও তাদের ফলাফল ভালোই হতো।’
টাইমস অব বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপে এই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় ভালো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বিসিএস থেকেও প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার মান বাড়ানো হচ্ছে। তাই সমাজের অগ্রসরমান শ্রেণির শিশুদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে আকৃষ্ট করতে একটি নীতিগত প্রচেষ্টা চলছে।
এদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ আগস্ট বিবৃতি দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
সেখানে বলা হয়, বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বচ্ছল। কিন্তু সরকারি প্রাথমিকের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই নিম্নবিত্ত পরিবারের। তাই এই বৃত্তি পরীক্ষাটি তাদের জন্য একটি আর্থিক প্রণোদনা।
কিন্তু মন্ত্রণালয়ের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও শিক্ষকরা। পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষাকে প্রণোদনা নয় বরং শিশুদের মেধা যাচাইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে অভিহিত করছেন তারা।
একইসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সেই বিবৃতির কিছু বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা।
তবে এসব বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কেউই কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। তারা বলছেন, এটি উচ্চ পর্যায়ের বিষয়। এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি স্কুলের বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছে টাইমস অব বাংলাদেশ।
তারা বলছেন, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়ার জন্য সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের জন্য উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন রকমের প্রণোদনার ব্যবস্থা আছে। সব সুবিধা নিয়েই সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা পঞ্চম শ্রেণির বার্ষিক সমাপনী পরীক্ষা দিচ্ছে তারা। আর বৃত্তি পরীক্ষা হয় সমাপনীর পর।
সেখানে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বাধা দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন তারা।
এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষায় যেমন সবাই অংশ নিতে পারে; পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তিতেও তেমনি সবার অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত বলেও মনে করেন এই অভিভাবক ও শিক্ষকরা।
কিন্ডারগার্টেন ঐক্য পরিষদের সভাপতি ইসকান্দার আলী হাওলাদার বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেছেন, যেহেতু মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে একটি রিট করা হয়েছে। তাই আদালত থেকে চূড়ান্ত রায় আসার আগ পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা ঠিক হবে না।’
১৭ জুলাই প্রকাশ হওয়া ওই প্রজ্ঞাপনের ওপর গত ২ সেপ্টেম্বর দুই মাসের স্থগিতাদেশ দেয় আদালত। একই সঙ্গে কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ না নিতে দেওয়ার নির্দেশনা অবৈধ হবে না, সেই বিষয়ে কারণ দর্শাতেও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জয়নুল আবেদীন জয় বলেন, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর যেমন “ইন (ইআইআইএন)” নম্বর আছে, বেসরকারি স্কুলগুলোরও আছে। সরকারিরা যেমন উপজেলা শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইটে তাদের আপডেট দেয়, বেসরকারিরাও তা দেয়। এমনকি সরকারের দেওয়া বিনামূল্যের বইও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পায়।’
‘কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা আছে, তাই দিন দিন এসব স্কুলের লেখাপড়ার মান ভালো হয়েছে। কিন্তু সরকারি স্কুলের লেখাপড়ার মান বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে মন্ত্রণালয়। তাই তাদের প্রশাসনিক দুর্বলতা ঢাকতে বেসরকারি স্কুলের প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থীর ওপর এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া অপচেষ্টা হচ্ছে।’
তবে সরকারের প্রজ্ঞাপনের ওপর আদালতের স্থগিতাদেশের ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান।
কিন্তু টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে যে নথি এসেছে, তাতে দেখা গেছে ৮ সেপ্টেম্বর আদালতের আদেশ সংক্রান্ত একটি কপি রিসিভ করেছে শিক্ষা অধিদপ্তর।
ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা এই বছরের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেছেন, ‘মন্ত্রণালয়ের যে নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল, আমরা সেই নির্দেশনা অনুসারেই সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়ন করাই অধিদপ্তরের কাজ। আমরা নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিই না। তবে আদালত যদি কোনো সিদ্ধান্ত দেয়, তাহলে তো তা মানতে হবে।’


