জুলাই সনদকে সম্মান দিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আপনাদের সকলকে অনুরোধ করব ধানের শীষে যেমন সিল মারবেন, একই সঙ্গে দ্বিতীয় ব্যালট পেপারে “হ্যাঁ”-এর পক্ষে রায় দেবেন। জুলাই সনদকে সম্মান দিয়ে গণভোটে “হ্যাঁ” ভোটে ভোট দিতে হবে।’
শুক্রবার রাত ৯টায় রংপুরে কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে বিভাগীয় নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মহানগর আহ্বায়ক ও রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামুর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলুসহ রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের এমপি প্রার্থীবৃন্দ।
তারেক রহমান বলেন, ‘যে অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য আবু সাঈদ নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে, চট্রগ্রামের ওয়াসিমসহ হাজারো মানুষ নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে। মানুষের কথা বলার অধিকার, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের এই জীবন উৎসর্গ করে মূল্যায়ন করতে পারব। একইভাবে তাদের জীবন উৎসর্গকে মূল্যায়ন করতে হলে আমরা যে জুলাই সনদে সই করেছি, সেই জুলাই সনদকেও আমাদের সম্মান করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজ সময় এসেছে আবু সাঈদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের। সময় এসছে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের। আল্লাহ তায়ালা যদি দেশ পরিচালনা করার সুযোগ দেয়, সুযোগটিকে দেশের কাজে জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করব। যাতে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে পারি। দেশকে গড়ে তুলতে হলে সকলকে একসঙ্গে পরিশ্রম করতে হবে। এই উত্তরঅঞ্চল আর মঙ্গাপীরিত থাকতে পারে না। এই বারে আমরা পরিবর্তন করতে পারব, যদি সামর্থন আমাদের সঙ্গে থাকে।’
‘বিগত ১৬ বছর নিশিরাতে নির্বাচন হয়েছে। এবার আর হতে দেব না। ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেব। ভোরে ভোটের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। ভোট গণনা শেষে রেজাল্ট নিয়ে বাড়ি যাবেন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘করব কাজ গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। দেশ ভালো থাকলে দেশের মানুষ ভালো থাকবে। আমাদের শক্তি দেশের জনগণ। দেশের মানুষের সিন্ধান্তের প্রথম ও শেষ সিন্ধান্ত।’
তিনি বলেন, ‘দুর্নীতির টুটি চেপে ধরতে হবে। বিগত ষোল বছর মেগা প্রজেক্টের নামে কীভাবে দুর্নীতি করা হয়েছে। যদি মেগা প্রজেক্ট হতো। তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি থাকত না, আর দেখেছি কীভাবে মেগা প্রকল্পের নমে মেগা দুর্নীতি হয়েছে। এই দূর্নীতির অবসান হতে হবে। আবু সাঈদের যেমন হত্যার বিচার হতে হবে। দেশের মানুষের সম্পদ লুটপাট করে যারা বিদেশে পাচার করেছে, অর্থ পাচার করেছে তাদেরও এই দেশে বিচার করতে হবে। পাচার হওয়া অর্থ বিদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে মানুষের মাঝে ব্যবহার করা হবে। এই কাজটিও যদি কেউ করতে পারে, সেটাও বিএনপির পক্ষেই করা সম্ভব। কারণ, একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যারা দুর্নীতিতেকে কত পেল, সেটা হিসাব যারা করে। তাদের হিসাব মতো ২০০১ সালে যখন খালেদা জিয়া দায়িত্ব পায়, তখন থেকে বাংলাদেশে দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হতে থাকে। বিএনপি এটিও প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে বিএনপি একমাত্র এই দেশ থেকে দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করতে।’
জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, ‘প্রিয় ভাই-বোনেরা, একটি দল আছে। সেই দল মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছে কয়েকদিন ধরে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। আজও দেখলাম তারা বলেছে। তাদের দুজন সদস্য ২০০১ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে সরকারে ছিল। এখন তারা বলছে নাকি বিএনপির সময় পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। তাহলে তাদের মানুষগুলো ভালো। আমাদের মানুষগুলো খারাপ। আমার প্রশ্ন হলো ভালো মানুষের সঙ্গেই তো ভালো মানুষ থাকে। তাহলে তারা যদি ভালো মানুষ আর বিএনপি যদি খারাপ মানুষ হয়ে থাকে। তাহলে তারা আমাদের সঙ্গে প্রথম থেকে শেষ দিন পর্যন্ত তারা ছিল। তাদের থাকাটাই প্রমাণ করে খালেদা জিয়া যে দুর্নীতির সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত থাকাটাই প্রমাণ করে যে বিএনপি একমাত্র দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, বিএনপির পক্ষেই সেটা সম্ভব। তাদের থাকাতেই প্রমাণ করে একমাত্র বিএনপির নেতৃত্ব এই দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পরে।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘এই দলটির মাথা খারাপ হয়ে গেছে। অথবা নিজের নেতৃত্বে সম্পর্কে নিজেই আবোল-তাবোল কথা বলছে। তারা ভুল কথা বলছে। কাজেই আমরা সেই বিতর্কে যেতে চাই না। আমাদের শক্তি হচ্ছে বাংলাদেশের জনগন। সেজন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে আমরা ফিরে যেতে চাই। আমাদের ভালো-মন্দ সবকিছু আমরা বাংলাদেশের মানুষের কাছে দিয়ে দিতে চাই। দেশের মানুষের সিদ্ধান্তই আমাদের প্রথম এবং শেষ সিদ্ধান্ত।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আবু সাঈদের কাঙ্খিত প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ার কাজে ইনশাল্লাহ আগামী মাসের ১৩ তারিখ থেকে আমরা হাত দেব। এই হোক আজকের নির্বাচনী জনসভার প্রতিশ্রুতি।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের পানি সমস্যা আছে। এই এলাকা (রংপুর অঞ্চল) কৃষিভিত্তির এলাকা তাই এখানে বেশি সমস্যা। ১২ তারিখে রায় হলে আমরা সরকার গঠন করতে পারলে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প সতেজ হবে এবং তিস্তুা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়, নিজের ভ্যাগ্যের পরিবর্তন চায়। মানুষ চায় কর্মসংস্থান। মানুষ চায় নিরাপদে রাস্তায় চলাফেরা করতে। মানুষ চায় নিরাপদে বাসায় ঘুমাতে। মানুষ চায় যে যার ব্যবসা-বাণিজ্য চাকরি সব করবে। সেই নিরাপদ ব্যবস্থা যদি তৈরী করতে হয় তাহলে আপনাদের সমর্থন লাগবে। আপনাদের সমর্থন থাকলে ইনশাআল্লাহ বিএনপি তা প্রতিষ্ঠিত করতে পরবে। কারণ বিএনপির অতীত ইতিহাস আছে আইনশৃঙ্খলা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সেটি বিএনপি একমাত্র অতীততে করে দেখিয়েছে। বিএনপির অভিজ্ঞতা আছে বলেই বিএনপির পক্ষেই সম্ভব একমাত্র দেশের আইনশৃঙ্খলা সঠিক ভাবে শক্তভাবে নিয়ন্ত্রন করা। শক্ত ভাবে মানুষের নিরাপত্তা প্রণয়ন করা।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আগস্টের ৫ তারিখে যে পরিবর্তন হযেছে যেটি কোন রাজনৈতিক দলের দ্বারা হয় নাই। নির্দিষ্ট কোর রাজনৈতিক দলের দ্বারা হয় নাই। সেই পরিবর্তনে এই দেশের সাধারণ শ্রেনী পেশার মানুষের অংশগ্রহন করেছিলো বলেই সেদিন সেই পরিবর্তন সূচিত হয়েছিলে।’ এ সময় বিএনপি চেয়ারম্যান বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জুলাই বিপ্লবে পুলিশের গুলিতে প্রথম শহীদ রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেছেন। পরে বাড়িতে গিয়ে তিনি তার পিতামাতার সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তার পিতা তারেক রহমানের কাছে শহীদ আবু সাঈদসহ সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করলে ক্ষমতায় গেলে তার পূরণ করার আশ্বাস দেন তারেক রহমান
শুক্রবার সন্ধ্যা ৫ টা ৫৫ মিনিটে সড়কপথে পৌঁছান রংপুরের পীরগঞ্জের বাবনপুরে আবু সাঈদের বাড়িতে যান। সেখানে পিতা মকবুল হোসেন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেন। পরে তিনি দোয়া মোনাজাতে অংশ নেন। এরপর তিনি যান বাড়িতে। সেখানে পিতা মকবুল হোসেন ও মাতা মনোয়ার, ভাই রমজান আলী, আবু হোসেনসহ পরিবারের সদস্যদের কাছে একসাথে বসেন। তাদের খোঁজ-খবর নেন। এবং তাদের কথা শোনেন। পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
এ সময় শহীদ আবু সাঈদের পিতা তারেক রহমানকে বলেন, ‘আল্লাহ যদি আপনাকে ক্ষমতায় আনেন, তাহলে প্রথমেই শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাই বিপ্লবে সকল শহীদ হত্যাকাণ্ডের বিচার করেবন। আহতদের সুচিকিৎসা সহ পুনর্বাসন করবেন। পীরগঞ্জসহ সাড়া বাংলাদেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন।
এ সময় তারেক রহমান মকবুল হোসেনকে প্রতিশ্রুতি দেন আবু সাঈদসহ সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করবেন এবং দেশের সকল সূচকে উন্নয়ন করবেন। তার আগমণ উপলক্ষে পুরো পীরগঞ্জে পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশসহ (বিজিবি) বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন।
সন্ধা ৬টা ২৬ মিনিটে তিনি আবু সাঈদের বাড়ি থেকে বের হয়ে রংপুরের কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠের জনসভার উদ্দেশে রওনা দেন। এর আগে, বগুড়া থেকে রংপুরের উদ্দেশে রওনা দিলে পথে পথে দুইপাশে দাড়িয়ে তাকে অভিনন্দন জানান নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। কালেক্টরেট মাঠ উপচিয়ে জনতার স্রাত উপচে পড়েছে নগরীর প্রধান সড়কে। এর আগে, বৃহস্পতিবার রাজশাহী, নওগাঁ ও বগুড়ায় নির্বাচনী জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তিনি।


