ভারতের লাদাখকে ‘পূর্ণ রাজ্য’ মর্যাদার দাবিতে চলমান ‘জেন জি’ আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ‘জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব’ সোনাম ওয়াংচুককে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। শুক্রবার তাকে লাদাখ থেকে গ্রেপ্তারের পর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে রাজস্থানের যোধপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
কোনো ধরনের গুজব যেন না ছড়ায় সে জন্য ওয়াংচুককে গ্রেপ্তারের পর লাদাখের প্রশাসনিক কেন্দ্র লেহ-তে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য বৃহস্পতিবার ওয়াংচুক বলেছিলেন, লাদাখের ‘যৌক্তিক স্বার্থের’ জন্য তিনি যেকোনো মুহূর্তে গ্রেপ্তার হতে প্রস্তুত আছেন। তার এমন বক্তব্যের পরেরদিনই গ্রেপ্তার হলেন ওয়াংচুক।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়, ভারতের কেন্দ্র সরকারের দাবি, সোনাম ওয়াংচুক সরকারবিরোধী বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে আরও উত্তেজিত করে তুলছেন। তার বিরুদ্ধে কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ) প্রয়োগ করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই আইনের আওতায় কোনো অভিযুক্তকে দীর্ঘমেয়াদে আটক রাখা যায়। এই সময়ে তার জামিনের সুযোগ নেই।

গত চার বছর ধরে লাদাখকে রাজ্য স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে লাদাখ অ্যাপেক্স বডি (এলএবি) ও কারগিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (কেডিএ)। আর ওই বিক্ষোভের পেছনে ‘মদদদাতা’ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে সোনাম ওয়াংচুককে।
তিনি একাধারে প্রকৌশলী, ‘স্তুপা আর্টিফিশিয়াল গ্লেসিয়ার’ নামক কৃত্রিম হিমবাহের উদ্ভাবক এবং লাদাখের আন্তহিমালয় অঞ্চলে ‘শিক্ষা সংস্কার’ নিয়ে কাজ করা এক পরিচিত মুখ। তার জীবনের ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয় বিশ্বনন্দিত বলিউড সিনেমা ‘থ্রি ইডিয়টস’। ওয়াংচুক লাদাখকে ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি জানাচ্ছেন, যাতে অঞ্চলটির পাহাড়িদের এলাকায় স্বায়ত্তশাসন কাঠামো নিশ্চিত হয়।
গত ১৮ দিন ধরে লাদাখের তরুণ ছাত্র-জনতাকে নিয়ে লেহ-তে তীব্র বিক্ষোভ গড়ে তোলেন ওয়াংচুক। এ সময় সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে অনশন শুরু করেন তিনি। কেন্দ্র সরকার একাধিকবার তাদের অনশন ভেঙে ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানালেও তা প্রত্যাখ্যান করেন বিক্ষুব্ধরা।

এমন পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার গোটা লাদাখ অচল করে দেওয়ার ঘোষণা দেন তারা। বিক্ষুব্ধদের ঠেকাতে বুধবার আন্দোলনে পুলিশ মারমুখী অবস্থান নিলে তা ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়। এ সময় অন্তত পাঁচজন নিহত ও ৭০ জনের বেশি আহত হন।
আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় অনশন ভাঙার ঘোষণা দেন ওয়াংচুক। এ সময় তিনি বিক্ষুব্ধদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে লক্ষ্যে স্থির থাকার পরামর্শ দেন। তারপর থেকেই লাদাখে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
ভারতের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদদের মতে, জেলে থাকা সোনাম ওয়াংচুক জেলের বাইরে থাকা সোনাম ওয়াংচুকের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী। তাকে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্তে বরং লাদাখের জনতা আরও বেশি কেন্দ্র সরকারবিরোধী হয়ে উঠবে।

জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি দুর্ভাগ্যজনক। বিজেপি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে না। সহিংসতা কেউ সমর্থন করছে না। বিজেপি কেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংস করে তুলল, তার জবাব দিতে হবে।’
বিরোধী কংগ্রেস নেতা গুলাম আহমদ মীর বলেন, ‘ওয়াংচুক কখনো সহিংসতাকে উৎসাহ দেননি। লাদাখের সমস্যাগুলো সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বিজেপি সরকার এখন ব্যর্থতা ঢাকতে তাকে গ্রেপ্তার করেছে।’
এদিকে ওয়াংচুককে গ্রেপ্তারের একদিন আগেই বৃহস্পতিবার ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার অলাভজনক সংস্থা ‘স্টুডেন্টস এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল মুভমেন্ট অব লাদাখ’-এর (এসইসিএমওএল) বিদেশি তহবিল গ্রহণের নিবন্ধন (এফসিআরএ আইন, ২০১০) বাতিল করে।
২০১৯ সালে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ রাজ্য বাতিলে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। সে সময় কেন্দ্র সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্থানীয়রা সমর্থন করলেও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক শূন্যতা, লেফটেন্যান্ট গভর্নরের শাসন এবং আলাদা রাজ্য মর্যাদার দাবিতে এক হয়ে আন্দোলন শুরু করে বৌদ্ধ-অধ্যুষিত লেহ ও মুসলিম-অধ্যুষিত কারগিলের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন একত্রিত হয়।


