বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশ বেশকিছু জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। তবে স্থিতিশীলতা, সংস্কার এবং উত্তরণ–এই ত্রিমুখী কৌশলের মাধ্যমে সেগুলোকে সুযোগে রূপান্তর করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
শনিবার ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘রোডম্যাপ ফর ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি ২০২৬: নেভিগেটিং রিস্কস, লেভারেজিং রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
দিনব্যাপী আয়োজিত এই সম্মেলনে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশনের প্রধান, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানটিতে মূলত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক গতিপথ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা করা হয়। সম্মেলনটি তিনটি বিশেষ সেশনে বিভক্ত ছিল–‘দ্য পলিসি কম্পাস’, ‘ক্যাপিটাল ফর গ্রোথ’ এবং ‘দ্য নিউ স্টেজ’।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের সামনে থাকা প্রধান পাঁচটি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে বলেন, ‘সংকট বা পরিবর্তনের সময়গুলো প্রায়শই অর্থপূর্ণ রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করে। রাজনৈতিক পরিবর্তন নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে, তবে তা প্রকৃত রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় লক্ষ্যের স্পষ্টতাও এনে দেয়।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত করার জন্য আমাদের সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং অবিচল অঙ্গীকার রয়েছে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টিতে প্রধান ৫ চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক বড় বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও তা ধীরগতির, যার ফলে ভোক্তার চাহিদা কিছুটা কম। বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে এবং তা সম্প্রসারণ করতে বাংলাদেশকে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে।
উৎপাদন ও বাণিজ্যের ওপর আর্থিক বাজারের প্রভাব বাড়ছে। সুদের হারের পরিবর্তন এবং বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের কারণে বাণিজ্য প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো যেখানে ১ থেকে ৪ শতাংশ হারে ঋণ পায়, সেখানে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশগুলোকে ৬ থেকে ১২ শতাংশ বা তারও বেশি সুদের হার মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ইউএনসিটিএডি-এর সাম্প্রতিক বিনিয়োগ নীতি পর্যালোচনার তথ্য উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, জলবায়ু ঝুঁকির কারণে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বার্ষিক অতিরিক্ত ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সুদ পরিশোধ করছে। বাহ্যিক ঋণ এবং জলবায়ু ঝুঁকি এখন একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি বিল এবং সব খাতের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য দেশের সামগ্রিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং উন্নয়নমূলক খাত থেকে সম্পদ অন্যদিকে ডাইভার্ট করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, ব্লকচেইন এবং ফাইভ-জি সংযোগের মতো উদ্ভাবনগুলো বিশ্ব বাণিজ্যকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। দেশগুলো কত দ্রুত এই প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করছে এটি চ্যালেঞ্জ হবে নাকি সুযোগ।
অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা গঠন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো দেশের নাগরিক, ব্যবসায়ী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা।
তিনি বলেন, ‘ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি করা যায় না। আমরা আমাদের নাগরিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আশ্বস্ত করতে চাই যে বাংলাদেশ স্থিতিশীল, অনুমানযোগ্য এবং ব্যবসার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।’
তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই নীতিতেই পরিচালিত হবে, যেখানে পারস্পরিক প্রবৃদ্ধি এবং যৌথ সমৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হবে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য, নিরপেক্ষ এবং গঠনমূলক রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকে আরও সক্রিয় এবং সহায়কের ভূমিকা পালনের জন্য নতুন করে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।


