ইতিহাসের সবচেয়ে রাজনৈতিক বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এর আগে কোনো বিশ্বকাপের আসরই এতটা ভূরাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হয়নি। একসময় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে মহাদেশীয় ঐক্যের উৎসব হিসেবে যে টুর্নামেন্টের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা এখন যুদ্ধ, কঠোর অভিবাসন নীতি, রেকর্ডসংখ্যক মধ্যপ্রাচ্যের দেশের অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতার খুব কাছাকাছি চলে যাওয়া ফিফা নেতৃত্বের কারণে এক জটিল রূপ ধারণ করেছে।
ফুটবলের সঙ্গে রাজনীতির মেলবন্ধন অবশ্য নতুন কিছু নয়। ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে মুসোলিনির ঘুষ দেওয়া রেফারি থেকে শুরু করে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তার গৌরব কুড়ানোর চেষ্টা—সবই ইতিহাসের অংশ। তবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, এবার আয়োজক দেশ নিজেই এই অস্থিরতার মূল উৎস।
এই পুরো আয়োজনের নেপথ্যে রয়েছে এমন এক সম্পর্ক, যা বিশ্বকাপের প্রস্তুতি পর্বের শুরু থেকেই মূল আলোচনায় ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে ফেরার পর থেকে ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনোকে যেন মার্কিন ক্ষমতার অলিন্দে স্থায়ীভাবে দেখা যাচ্ছে।
এই টুর্নামেন্টের আগে তিনি আটবার ওয়াশিংটন সফর করেছেন, যার মধ্যে পাঁচবারই গিয়েছেন ওভাল অফিসে। ট্রাম্পের নানা বার্তা তিনি নিজের যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেছেন, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে ফেরার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন, এমনকি বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানের ভেন্যুও লাস ভেগাসের স্ফিয়ার থেকে সরিয়ে ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টারে নিয়ে গেছেন।
তবে সবচেয়ে বড় ঘটনা বিতর্কিত অধ্যায়টি তৈরি হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। ফিফা সম্পূর্ণ নতুন একটি পুরস্কারের প্রচলন করে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের হাতে প্রথম ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ তুলে দেয়। শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ট্রফি, মেডেল ও সনদ দেওয়া হয়। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে, যে ইরান এই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা অন্যতম একটি দেশ।
ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর এই ঘনিষ্ঠতা তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ফেয়ারস্কয়ার’ ফিফার নীতিশাস্ত্র কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের প্রতি ইনফান্তিনোর অতিমাত্রায় প্রশংসা এবং ড্র অনুষ্ঠানের রাজনৈতিক রূপ ফিফার নিজস্ব নিরপেক্ষতার নীতিকে লঙ্ঘন করেছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটের কারণে এই সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে। ২০১৬ সালে যখন এই বিশ্বকাপের যৌথ বিড বা আবেদন করা হয়েছিল, তখন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে এটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সর্বজনীন এক আসর, যা একটি ঐক্যবদ্ধ মহাদেশের উৎসব হিসেবে উদযাপিত হবে। অথচ এর পর থেকে ট্রাম্প মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিল করেছেন, কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন এবং মেক্সিকোর ড্রাগ কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের হুমকি দিয়েছেন।
এই রাজনৈতিক উত্তেজনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ইরানের ওপর। বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা একটি দেশ এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে আসছে যখন দেশ দুটি কার্যত যুদ্ধে লিপ্ত। দলের বিদায় সংবর্ধনায় যে ইরানি সমর্থকরা ‘আমেরিকার ধ্বংস হোক’ বলে স্লোগান দিয়েছিলেন, তাদের এই টুর্নামেন্ট দেখার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ইরান দলের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে খেলার কথা থাকলেও ওয়াশিংটন পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে ইরানি দলকে তাদের দেশে রাখার অনুমতি দেয়নি। ফলে ফিফা অফিশিয়ালি তাদের আবাসন মেক্সিকোর টিজুয়ানায় স্থানান্তর করেছে। ম্যাচের দিনগুলোতে ইরানের খেলোয়াড়দের সীমান্ত পার হয়ে যাতায়াত করতে হবে।
এ বিষয়ে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ইরানি দলকে স্বাগত জানানো হলেও তাদের নিজস্ব জীবন ও নিরাপত্তার স্বার্থে সেখানে থাকাটা সমীচীন বলে তিনি মনে করেন না। তার এই বার্তাটি একাধারে হুমকি ও সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ইরানের এই পরিস্থিতির পাশাপাশি এবার বিশ্বকাপে আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর রেকর্ডসংখ্যক উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এবার আটটি আরব বা মুসলিম দেশ খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে, যা ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের আগের রেকর্ড চারটির চেয়ে দ্বিগুণ। সৌদি আরব, কাতার, ইরাক, জর্ডান, মরক্কো, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া এবং মিশর—সবাই এবারের আসরে লড়বে। এর মধ্যে জর্ডান এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলা মরক্কো এবার শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে মাঠে নামবে।
দল সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮টি করার কারণেই মূলত এই অঞ্চলের এত বেশি দেশ সুযোগ পেয়েছে, যা একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ফুটবলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তারই বহিঃপ্রকাশ। তবে এর ফলে এমন অনেক মুসলিম প্রধান দেশের নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখছেন, যাদের জন্য গত কয়েক মাস ধরে ভিসা প্রাপ্তি সীমিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া তারা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, সেসব দেশেরই একটির সঙ্গে সামরিক সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে।
বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা চারটি দেশ—ইরান, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট এবং হাইতির নাগরিকরা বর্তমানে কোনো ধরনের মার্কিন ভিসা পাচ্ছেন না। কেবল খেলোয়াড় ও কোচদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও প্রায় ডজন খানেক দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের আগে পাঁচ থেকে পনেরো হাজার ডলারের বন্ড বা জামানত দিতে হচ্ছে। এর ফলে অতীতের বিশ্বকাপগুলোতে নিজ দেশের খেলা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা সাধারণ সমর্থকরা এবার সবচেয়ে বড় বাধার মুখে পড়েছেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু দাবির পর ইউরোপের রাজনৈতিক ও ক্রীড়াব্যক্তিত্বরা সাময়িকভাবে এই বিশ্বকাপ বয়কটের বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডস থেকে এই বয়কটের আহ্বান জানানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই আহ্বান বাস্তবায়িত না হলেও এমন আলোচনার সূত্রপাত হওয়াটাই অনেক বড় সংকেত। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরুর আগেই রাজনীতি নিয়ে যে পরিমাণ বিতর্ক ও শোরগোল তৈরি হয়েছে, তা অতীতে রাশিয়ার গভীর বিতর্কিত কিংবা কাতারের বিশ্বকাপের চেয়েও অনেক বেশি।
যারা সব বাধা পেরিয়ে মাঠে খেলা দেখতে আসবেন, তারা প্রতিটি পদক্ষেপে ক্ষমতার এক অদ্ভুত আবহ দেখতে পাবেন। মেক্সিকো তাদের সীমান্তে এক লাখ নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করেছে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ ড্রাগ কার্টেল দমনের চেয়ে ওয়াশিংটনকে একটি বার্তা দেওয়ার জন্যই বেশি করা হয়েছে।
কানাডায় ফুটবল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয় হলেও তাদের দক্ষিণ প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন পুরো আবহে প্রভাব ফেলছে। আর এসব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্বয়ং ট্রাম্প। চলতি বছরের শুরুর দিকে ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে পুরস্কার বিতরণের স্বাভাবিক প্রটোকল ভেঙে ট্রফি দেওয়ার মূল মঞ্চে তিনি দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করেছিলেন।
ট্রাম্পের কাছে এই বিশ্বকাপ নিজেকে বিশ্বমঞ্চের একজন ক্ষমতাধর নেতা হিসেবে জাহির করার বড় সুযোগ। অন্যদিকে ইনফান্তিনো ও ফিফার কাছে এটি জীবনে একবারই আসার মতো বিপুল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম। তবে বাকি বিশ্ব এই আয়োজন থেকে কী পাবে-তা এখনো এক বড় প্রশ্ন।
ইতিহাসে এর আগে কোনো বিশ্বকাপে এত বেশি দল, এত বেশি ম্যাচ এবং এত বেশি রাজনৈতিক জটিলতা একসাথে দেখা যায়নি। এখন মাঠের ফুটবল সেই রাজনৈতিক জটিলতাকে ছাপিয়ে দর্শকদের আনন্দ দিতে পারবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।


