বরাবরই ফুটবলের সেরা প্রতিভাদের প্রদর্শনী হিসেবে কাজ করে বিশ্বকাপ। এর পাশাপাশি খেলাধুলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলোর পরীক্ষা ক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা রেখেছে এই টুর্নামেন্ট। ২০১৪ সালে গোল-লাইন প্রযুক্তির প্রবর্তন থেকে শুরু করে ২০১৮ সালে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর-এর ব্যাপক ব্যবহার পর্যন্ত, প্রতিটি টুর্নামেন্টই খেলায় প্রযুক্তি কীভাবে সহায়তা করতে পারে তার সীমানা বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রযুক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উন্নত আসর হতে চলেছে। ফিফা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত সেন্সর এবং রিয়েল-টাইম ডাটা বিশ্লেষণের একগুচ্ছ উদ্ভাবন নিয়ে আসছে। এর মূল লক্ষ্য ম্যাচ পরিচালনা, কোচিং এবং সমর্থকদের অভিজ্ঞতা উন্নত করা।
এবার প্রযুক্তি উন্নয়নের কেন্দ্রে রয়েছে ম্যাচের মূল ফুটবলটি। ফিফার অফিশিয়াল বল ‘অ্যাডিডাস ট্রিওন্ডা’র ভেতরে রয়েছে একটি মোশন-সেন্সর চিপ। এই চিপটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের নড়াচড়ার তথ্য রেকর্ড করতে পারে। এই সেন্সর ম্যাচ পরিচালনাকারীদের বলের প্রতিটি স্পর্শ সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য দেয়। এর ফলে একজন খেলোয়াড় ঠিক কোন মুহূর্তে বলটি স্পর্শ করেছেন তা সহজে শনাক্ত করা যায়।
অফসাইডের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বলটি কখন পাস করা হয়েছে তা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করার মাধ্যমে রেফারিরা আরও দ্রুত এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে বিচার করতে পারেন আক্রমণভাগের কোনো খেলোয়াড় শেষ ডিফন্ডারের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন কি না। এই ব্যবস্থা হ্যান্ডবল এবং বিতর্কিত স্পর্শগুলো শনাক্ত করতেও সাহায্য করতে পারে। একাধিক ক্যামেরার কোণ থেকে দেখার পরেও যেসব ঘটনা বিচার করা প্রায়ই কঠিন হতো, এখন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তা সহজ হবে।
স্মার্ট-বল প্রযুক্তিকে আপাতদৃষ্টিতে বৈপ্লবিক মনে হলেও এটি আসলে একটি দীর্ঘ যাত্রার সর্বশেষ ধাপ। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে ফিফা অ্যাডিডাসের ‘আল রিহলা’ ম্যাচের বলের মাধ্যমে প্রথম কানেক্টেড-বল প্রযুক্তির পরিচয় করিয়ে দেয়। সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সিস্টেমটি রেফারিদের আরও দ্রুত এবং নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল। সেই পরীক্ষার সাফল্যই ২০২৬ সালের আসরে আরও উন্নত সংস্করণ ব্যবহারের পথ তৈরি করে দিয়েছে।
আগামী টুর্নামেন্টের সবচেয়ে চমকপ্রদ উদ্ভাবন হতে পারে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ১ হাজার ২৪৮ জন খেলোয়াড়ের ডিজিটাল অ্যাভাটার বা ত্রিমাত্রিক রূপ তৈরির পরিকল্পনা। প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগে প্রতিটি খেলোয়াড়ের একটি দ্রুত বডি স্ক্যান করা হবে। এই স্ক্যানের মাধ্যমে তৈরি হবে তাদের ত্রিমাত্রিক মডেল।
এই ডিজিটাল রূপগুলো রেফারি এবং ভিডিও অফিশিয়ালদের যেকোনো ঘটনা আরও কার্যকরভাবে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে যখন খেলোয়াড়রা খুব দ্রুত গতিতে দৌড়ান বা অন্য খেলোয়াড়দের কারণে আংশিকভাবে আড়ালে চলে যান, তখন এটি দারুণ কাজে দেবে। এই প্রযুক্তিটি ফিফার সেমি-অটোমেটেড অফসাইড সিস্টেমের সঙ্গে কাজ করবে। এই সিস্টেমটি স্টেডিয়ামের ক্যামেরার সাহায্যে প্রতি সেকেন্ডে কয়েক ডজন বার খেলোয়াড় এবং বলের অবস্থান ট্র্যাক বা পর্যবেক্ষণ করে।
সমর্থকদের জন্য এই ডিজিটাল মডেলগুলো খেলা দেখার অভিজ্ঞতার একটি অংশ হয়ে উঠবে। সম্প্রচারকারীরা রিপ্লের সময় এগুলো ব্যবহার করতে পারবেন। এর ফলে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর আরও স্পষ্ট ভিজ্যুয়ালাইজেশন বা দৃশ্যমান চিত্র ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হবে। দর্শকরাও ঠিক বুঝতে পারবেন কেন একজন খেলোয়াড়কে অফসাইড দেওয়া হলো বা সেখানে কোনো ফাউল হয়েছিল কি না।
গত দুই দশকে বিশ্বকাপে উন্নত ট্র্যাকিং প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমাগত বেড়েছে। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের সময় দলগুলো ভিডিও বিশ্লেষণ এবং পারফরম্যান্স ডাটার ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করে। তবে তখন এ জাতীয় সরঞ্জামগুলো মূলত পর্দার আড়ালেই থাকত। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে গোল-লাইন প্রযুক্তি একটি বড় মাইলফলক হয়ে ওঠে। এর ফলে বল গোল লাইন অতিক্রম করেছে কি না তা রেফারিরা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারতেন।
চার বছর পর রাশিয়ায় ভিএআর ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই টুর্নামেন্টের চিত্র বদলে দেয়। রেফারিরা গোল, পেনাল্টি, লাল কার্ড এবং ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণের মতো বিষয়গুলোর জন্য ভিডিও পর্যালোচনার সুযোগ পান। শুরুতে এই ব্যবস্থা নিয়ে নানা মতভেদ থাকলেও এটি ম্যাচ পরিচালনায় বড় ভুলগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এরপর থেকে এটি হয়ে উঠেছে বিশ্বমানের ফুটবলের স্থায়ী বৈশিষ্ট্য।
২০২৬ বিশ্বকাপে ‘রেফারি ভিউ’ নামে একটি এআই-সহায়তা প্রাপ্ত ক্যামেরা সিস্টেমও চালু করা হবে। মাঠের রেফারিরা যেভাবে খেলাটি দেখেন, দর্শকদেরও ঠিক সেই অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। এই প্রযুক্তি রেফারির দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণ করা ফুটেজকে স্থির ও স্পষ্ট করে তোলে। এর ফলে স্টেডিয়ামে থাকা এবং ঘরে বসে থাকা সমর্থকরা মাঠের মূল কেন্দ্র থেকে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে পারবেন।
ম্যাচ পরিচালনা এবং সম্প্রচারের বাইরেও ফিফা কোচ এবং বিশ্লেষকদের সহায়তা করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে ঝুঁকছে। তাদের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলোর একটি হলো ‘ফুটবল এআই প্রো’। এটি একটি ডিজিটাল সহকারী যা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী সমস্ত দলকে সরবরাহ করা হবে।
এই প্ল্যাটফর্মটি ম্যাচ এবং অনুশীলন সেশনগুলো বিশ্লেষণ করবে। এরপর এটি কৌশলগত ধারণা, পারফরম্যান্সের প্রতিবেদন এবং স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত পরামর্শ তৈরি করবে। কোচিং স্টাফদের বিপুল পরিমাণ তথ্য ঘেঁটে দেখার ঝামেলা থেকে এটি মুক্তি দেবে। সিস্টেমটি নিজেই সমস্ত তথ্যকে ব্যবহারিক পরামর্শে রূপান্তর করবে, যা ম্যাচের আগে, চলাকালীন এবং পরে ব্যবহার করা যাবে।
ফুটবল এআই প্রো ম্যাচের ঘটনাগুলোর লিখিত সারসংক্ষেপ, ভিডিও বিশ্লেষণ এবং গ্রাফিকাল উপস্থাপনাও তৈরি করতে পারে। ফিফা বিশ্বাস করে, এই প্রযুক্তি খেলায় সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে সাহায্য করবে। এর মাধ্যমে প্রতিটি দেশ এমন পরিশীলিত বিশ্লেষণাত্মক সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ পাবে যা একসময় কেবল সবচেয়ে ধনী ফুটবল ফেডারেশনগুলোর কাছেই সহজলভ্য ছিল।
তথ্যের এই গণতন্ত্রীকরণের ওপর জোর দেওয়া আধুনিক ফুটবলের একটি বড় প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্লাব এবং জাতীয় দলগুলো প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য অ্যানালিটিক্স বিভাগ, মেশিন লার্নিং মডেল এবং ট্র্যাকিং সিস্টেমের ওপর দিন দিন বেশি নির্ভর করছে। ফিফার সর্বশেষ উদ্যোগের লক্ষ্য এই সম্পদগুলো বিশ্বজুড়ে সবার জন্য সহজলভ্য করা।
বিশ্বকাপ যেহেতু একটি নতুন যুগে প্রবেশ করছে, তাই প্রযুক্তি এখন দর্শকে ঠাসা স্টেডিয়াম এবং অবিস্মরণীয় গোলগুলোর মতোই এই টুর্নামেন্টের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। ফুটবলে প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নিশ্চিতভাবেই চলতে থাকবে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখিয়ে দেবে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা সায়েন্স এবং উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেম এই খেলাকে চিরতরে বদলে দিচ্ছে।


