মাঠে বল গড়াচ্ছে পায়ে পায়ে, আর মাঠের বাইরে টেবিল কাঁপছে সমীকরণের ঝড়ে। চলতি বিশ্বকাপ ফুটবলের গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডের সব ম্যাচ শেষ না হতেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলারদের চেয়েও যেন বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ডেটা অ্যানালিস্ট এবং তথাকথিত ‘ভবিষ্যৎদ্রষ্টা’রা। একদিকে সিলিকন ভ্যালির লাখ লাখ ডেটা প্রসেস করা ‘সুপার কম্পিউটার’, অন্যদিকে অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদার জ্যোতিষী আর বিচিত্র সব প্রাণী— কার গণনা মিলবে আর কারটা ভেস্তে যাবে, তা নিয়ে ফুটবল পাড়ায় এখন চলছে তুমুল আলোচনা।
২১ জুন পর্যন্ত দুই রাউন্ডের কিছু অপ্রত্যাশিত অঘটন এবং বড় দলগুলোর পয়েন্ট হারানোর পর, সর্বশেষ আপডেটে ট্রফি জয়ের দৌড়ে এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন।
সুপার কম্পিউটারের রায়: ফেভারিট আর্জেন্টিনা-হল্যান্ড
বিশ্বের নামী ক্রীড়া পরিসংখ্যান সংস্থাগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সুপার কম্পিউটারগুলো টুর্নামেন্টের শুরু থেকে প্রতি সেকেন্ডের ডেটা বিশ্লেষণ করছে। পাসিং অ্যাকুরেসি, ট্যাকল, খেলোয়াড়দের ফিটনেস এবং এমনকি ভেন্যুর আবহাওয়া— সবকিছু মাথায় রেখে ২১ জুনের সর্বশেষ প্রক্ষেপণে বড় ধরনের ওলটপালট দেখা গেছে।
গ্রুপ পর্বের শুরুতেও যেখানে ব্রাজিল-জার্মানি ফ্রান্সকে ট্রফি জয়ের প্রধান দাবিদার ধরা হচ্ছিল, দ্বিতীয় ম্যাচের পর সুপার কম্পিউটারের অ্যালগরিদমে তাদের গ্রাফ অনেকটাই নিচের দিকে। কেপ ভার্দ কিংবা কিউরাসাওয়ের মতো দলগুলোর অনবদ্য ডিফেন্সিভ ফুটবলের কারণে বড় দলগুলোর গোল করার সম্ভাবনা গাণিতিকভাবে কমে গেছে।
সুপার কম্পিউটারের নতুন প্রেডিকশন অনুযায়ী, এই মুহূর্তে ট্রফি ধরে রাখার দৌড়ে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির দুর্দান্ত ফর্ম এবং মাঝমাঠের ধারাবাহিকতার কারণে আলবিসেলেস্তেদের ট্রফি জয়ের সম্ভাবনা এক লাফে ২২.৪%-এ গিয়ে ঠেকেছে। এর ঠিক পেছনেই রয়েছে উড়ন্ত ফর্মে থাকা নেদারল্যান্ডস (১৮.৭%)।
জ্যোতিষীদের ‘ঐশ্বরিক’ চোখ
সুপার কম্পিউটার যখন শতকোটি ডেটা প্রসেস করতে ব্যস্ত, তখন জ্যোতিষী এবং ভবিষ্যৎদ্রষ্টারা হাঁটছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। ২০১০ বিশ্বকাপের ‘পল দ্য অক্টোপাস’-এর পর থেকে প্রতি বিশ্বকাপেই প্রাণীদের দিয়ে ম্যাচ প্রেডিকশনের একটা ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
এবার মেক্সিকোর এক বিখ্যাত ‘টিয়া পাখি’ এবং জার্মানির এক ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’কে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে জোর চর্চা। মজার ব্যাপার হলো, ২১ জুনের ম্যাচে যেখানে সুপার কম্পিউটার জাপানের জয় নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত ছিল না, সেখানে মেক্সিকান সেই টিয়া পাখিটি তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জাপানের জয়ের বাক্সটিই আগে ঠুকরেছিল!
তবে ট্রফি কে নেবে— এই প্রশ্নে জ্যোতিষীদের সাথে সুপার কম্পিউটারের লেগে গেছে তুমুল দ্বন্দ্ব। ইউরোপের বেশ কয়েকজন নামী জ্যোতিষীর দাবি, গ্রহের অবস্থান এবং সংখ্যার হিসাব বলছে— এবার ল্যাটিন আমেরিকা নয়, বরং ইউরোপের কোনো দেশ ট্রফি নিয়ে ঘরে ফিরবে। সেই দেশও হতে পারে পর্তুগালের মতো কোনো ‘ডার্ক হর্স’!
বিজ্ঞান নাকি মনস্তত্ত্ব?
সোশ্যাল মিডিয়ার ফুটবল গ্রুপগুলোতে এখন এই দুই মেরুর ভবিষ্যৎবাণী নিয়ে চলছে চায়ের কাপে ঝড়। বিজ্ঞানমনস্ক ফুটবলপ্রেমীদের দাবি, আধুনিক ফুটবল এখন পুরোপুরি ডেটা এবং ট্যাকটিক্সের খেলা, তাই সুপার কম্পিউটারের হিসাবই দিনশেষে মিলবে।
অন্যদিকে, সাধারণ ফুটবল রোমান্টিকদের মত ভিন্ন। তাদের মতে, ফুটবল কোনো ল্যাবরেটরির পরীক্ষা নয় যে সমীকরণ মিলিয়ে সব হবে। মাঠে ল্যামিন ইয়ামালের ইনজুরি কিংবা আইভরি কোস্টের তারকা এলি ওয়াহির শেষ মুহূর্তে ভিসা না পাওয়ার মতো মানবিক ও আকস্মিক ঘটনাগুলো কোনো কম্পিউটার আগে থেকে টের পায় না। ফুটবলের সৌন্দর্যই লুকিয়ে আছে এর ‘অনিশ্চয়তা’র মধ্যে, যা কোনো অ্যালগরিদম দিয়ে বাঁধা সম্ভব নয়।
শেষ হাসি হাসবে কে?
সুপার কম্পিউটারের প্রসেসর আর জ্যোতিষীদের ভাগ্যগণনা— দুই পক্ষই এখন নিজেদের দাবিতে অনড়। তবে ফুটবল ইতিহাস বলে, মাঠের ৯০ মিনিটে যখন টানটান উত্তেজনা থাকে, তখন সব সমীকরণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি হয় নতুন কোনো রূপকথা। ২০২৬ সালের ২০ জুলাইয়ের সেই মহেন্দ্রক্ষণে কাপটা কার হাতে উঠবে— সুপার কম্পিউটারের নিখুঁত প্রেডিকশনে নাকি কোনো জ্যোতিষীর অদ্ভুত ইশারায়, তা দেখার জন্য আপাতত ফুটবল বিশ্বকে মাঠের লড়াইয়েই চোখ রাখতে হচ্ছে।


