ফুটপাত আছে, হাঁটার জায়গা নেই পথচারীর

ফুটপাত আছে, হাঁটার জায়গা নেই পথচারীর
ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

নগর কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর মানুষের অসচেতনতায় ঢাকার ফুটপাতগুলো পথচারীবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি কখনও। যেন এর আরও অবনতি হচ্ছে দিনে দিনে। পরিস্থিতি এমন যে, যাদের হাঁটার জন্য এটি নির্মাণ করা, সেই পথচারীই সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় থাকে।

কোথাও হকার, কোথাও দোকানের বর্ধিতাংশ, কোথাও গাড়ি মেরামত, কোথাও পার্কিং; মোটরসাইকেল চলাচল আরেক বিরক্তির কারণ, বাইসাইকেল চালকদের যেন ধারণাই নেই সেখানে তাদের ওঠার কথা নয়।

এর মধ্যে নগর কর্তৃপক্ষ আবার দখলবাজিকে বৈধতা দিতে যাচ্ছে, যেখানে ফুটপাতকে ভাড়ার বিনিময়ে বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি উচ্চ আদালতের নজরে এসেছে, সর্বোচ্চ আদালত থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তবে ফুটপাতে মোটরসাইকেল ঠেকাতে দেওয়া আদেশ এক দশকেরও বেশি সময় পরে ভুলেই গেছে পুলিশ।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে রাজধানীতে দৈনন্দিন যাত্রার ১৯ থেকে ২০ শতাংশ ছিল হাঁটাভিত্তিক। বর্তমানে সেটি বেড়ে ৩৮ দশমিক শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ মানুষ হাঁটছে।

ডিটিসিএর ‘এসটিপি ২০২৫’ খসড়া প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকায় মোট প্রায় ১ হাজার ৮৪০ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৩ শতাংশ দুই মিটার বা তার বেশি চওড়া। ১৬৩টি প্রধান ফুটপাতের অন্তত ১০৮ কিলোমিটার অংশ অবৈধ দখল।

রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহতদের প্রায় ৭৩ শতাংশই পথচারী। ফুটপাত ব্যবহার করতে না পারা এবং বাধ্য হয়ে সড়কে নেমে হাঁটাই এর অন্যতম বড় কারণ।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের একটা অংশ মিলে এক চক্র আছে। ফুটপাতের ব্যবসা থেকে আসা টাকার বড় একটি অংশ এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করে।’

সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু হকার উচ্ছেদ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না, বলেন তিনি।

‘বিরক্তি ধরে যায়’

শাহবাগ মেট্রো স্টেশন থেকে নেমে বারডেম হাসপাতালের দিকে হাঁটতে গিয়ে রেদওয়ানুল করীম রিকনকে ফুটপাত থেকে নেমে যেতে হলো। কারণ, সেটি ফলসহ নানা পণ্যের দোকানিরা এমনভাবে দখল করে নিয়েছেন যে আর হাঁটার জো ছিল না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রমি আক্তার বলেন, ‘ফুটপাতে এই বিশৃঙ্খলা দেখলে বিরক্তি ধরে যায়।’

হাসপাতালে রোগী দেখতে আসা কামাল হোসেন বলেন, ‘অসুস্থ মানুষ নিয়ে হাঁটার মতোও জায়গা নেই।’

মিরপুর থেকে গুলিস্তান, ফার্মগেট থেকে নিউমার্কেট, কারওয়ানবাজার থেকে মহাখালী, মালিবাগ থেকে মতিঝিল রাজধানীর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাতে একই চিত্র। কোথাও আবার নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ, তাছাড়া ভিক্ষুক বা ভবঘুরেদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানতো আছেই।

লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা শাফিন আহমেদ বলেন, ‘ফুটপাতে হাঁটা যায় না। বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়। এতে আমাদের যেমন ঝুঁকি থাকে, তেমনি যানজট বাড়ে।’

মহাখালীর বাসিন্দা আবু তৈমুর বলেন, ‘এ পথের ফুটপাত তো দখলেই, রাস্তাও দখল হয়ে গেছে। হেঁটেও যাওয়া যায় না, যানজটের জন্য গাড়িতেও উঠতে ইচ্ছা করে না।’

উন্মুক্ত বাজার, গাড়ির ওয়ার্কশপ

ঢাকা কলেজের বিপরীত পাশ থেকে নুরজাহান মার্কেট হয়ে হকার্স মার্কেট পর্যন্ত প্লাস্টিকের সামগ্রী, রান্নাঘরের জিনিসপত্র, কাপড়, খেলনা, খাবার—সব মিলিয়ে পুরো এলাকা বিশাল উন্মুক্ত বাজারে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন

বাংলামোটর থেকে মগবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত কয়েকটি অংশে ফুটপাত ও রাস্তার ধারে দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি মেরামতের কাজ চলে। কোথাও খোলা অবস্থায় পড়ে থাকে গাড়ির যন্ত্রাংশ, কোথাও ইঞ্জিন খুলে রাখা, কোথাও বডি রং করা হচ্ছে, কোথাও সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে মেরামতের অপেক্ষায় থাকা গাড়ি।

পথচারীদের কখনও গাড়ির নিচে ঝুলে থাকা যন্ত্রাংশ এড়িয়ে যেতে হয়, কখনও রাস্তার ওপর নেমে হাঁটতে হয়। কোথাও তেল-গ্রিজ ছড়িয়ে থাকায় হাঁটাও হয়ে ওঠে বিপজ্জনক।

ফুটপাতে বাইক: আদালতের আদেশ উপেক্ষা

বাংলামোটরের ফুটপাতে হাটছিলেন সাঈদা বেগম। তার পেছনে এসে এক বাইকার হর্ন দিতে পেছনে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে দেয়াল ঘেষে দাঁড়িয়ে মোটরসাইকেলটিকে রাস্তা ছেড়ে দিলেন তিনি।

‘রাস্তা না ছেড়ে কী করব, এখানে প্রায় প্রতিদিনই এ ঘটনা ঘটে। সিগনালে জ্যাম পড়লে ফুটপাথে গাড়ি নিয়ে উঠে যায় মানুষজন সামনে এগোনোর জন্য,’ টাইমসকে বলেন তিনি।

যানজট এড়াতে এবং সিগনালের কিছু সময় বাঁচাতে অনেক মোটরসাইকেল চালক ফুটপাতে উঠে যান। এতে পথচারীদের নিরাপত্তা বিপন্ন হচ্ছে, তবে এক্ষেত্রে প্রশাসনের বা ট্রাফিক পুলিশের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেই।

অথচ ২০১২ সালে হাইকোর্টের এক আদেশে ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালালে চালকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছে। কিন্তু পুলিশ কখনও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।

সাঈদা বলছেন, ‘প্রথমদিকে দুয়েকবার প্রতিবাদ করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু দেখলাম এসব নিয়ে যতই কথা বলি, মোটরসাইকেল চালকরা শোনেন না। অনেক সময় তারা আরও উগ্রভাবে তেড়ে আসেন।’

ফার্মগেটে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্যর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, তারা নিয়মিতই বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন, তবে তা যথেষ্ট কার্যকরী হচ্ছে না।

ফার্মগেট, কাওরানবাজার, মতিঝিল, গুলশান, বাড্ডা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় প্রায়ই দেখা যায়, হাঁটার পথজুড়ে সারি সারি মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে। কোথাও সেডান কার, কোথাও পণ্যবাহী ভ্যান, কোথাও আবার অস্থায়ী পার্কিং ব্যবস্থাই গড়ে উঠেছে ফুটপাতের ওপর।

দখলের পেছনেও কত গল্প!

নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, গুলিস্তান, ফার্মগেট, শাহবাগ কিংবা মহাখালী যেখানেই হকারদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, প্রায় সবার বক্তব্যে একটি বিষয়ই ঘুরে ফিরে এসেছে: বিকল্প কর্মসংস্থান নেই বা ব্যবসাস্থলও নেই।

লক্ষ্মীবাজারে ফুটপাতে দোকান চালানো নাসির হোসেন বলেন, ‘ছোট একটা দোকান কইরা সংসার চালাই। এটা চালাইতেও কত দেনদরবার করা লাগে। আমাগো ব্যবসার জায়গা কইরা দেক, আমরা সেখানে যামু।’

শাহবাগের এক ফল বিক্রেতা বলেন, ‘ফুটপাত দখল করলে মানুষ হয়তো বিরক্ত হয়, কিন্তু আমাদের তো পরিবার নিয়ে খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে।’

নিউমার্কেট এলাকার সবুজ আলী বলেন, ‘সরিয়ে দিলে কোথায় যাব? আমরা কারও ক্ষতি করতে চাই না। যদি উচ্ছেদ করতেই হয়, তাহলে আগে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।’

ফুটপাতে ব্যবসা করতে হলে কোনো না কোনোভাবে নিয়মিত অর্থ কিন্তু দিতে হয়।

ফার্মগেটের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কেউ বিদ্যুতের বিলের নামে নেয়, কেউ সমিতির নামে।’

হকারদের কেউ স্থানীয় প্রভাবশালীর দিকে আঙুল তুলেছেন, কেউ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কথা বলেছেন, আবার কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেছেন।

হকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীজুড়ে বর্তমানে প্রায় আড়াই লাখ ব্যবসায়ী রয়েছেন। ব্যবসার ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী দিনে ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।

নিস্ফল অভিযান
ঢাকার মানুষ বছরের পর বছর ধরে ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানের দৃশ্য দেখে আসছে। এরপর কয়েক দিনের জন্য ফুটপাত ফাঁকা হয়। পথচারীরা কিছুটা স্বস্তি পান। তারপর ধীরে ধীরে আগের চিত্র ফিরে আসে, অনেক ক্ষেত্রে দুই-তিন দিনের মধ্যেই।

গত ১ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পুলিশ রাজধানীজুড়ে সমন্বিত অভিযান চালায়। ফুটপাতের অবৈধ দোকান, ভ্রাম্যমাণ হকার, অননুমোদিত পার্কিং এবং অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পর গুলিস্তান, ধোলাইখাল, কলাবাগান, পল্টন, মতিঝিল ও নিউমার্কেটে গিয়ে আবারও আগের দৃশ্য দেখা যায়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বলছে, গত এক বছরে তারা ৩৫১টি অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৬৬ কিলোমিটার ফুটপাত দখলমুক্ত করেছে।

এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ফুটপাত হকারদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে গত ১৯ মে এই সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট।

আইনজীবী মো. শোয়েবুজ্জামানের করা রিট আবেদনে বলা হয়, ফুটপাত মূলত জনসাধারণের চলাচলের জন্য নির্মিত অবকাঠামো। সেখানে ব্যবসার অনুমোদন দেওয়া সংবিধানে স্বীকৃত নাগরিকদের অবাধ চলাচলের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জোবায়ের হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘ফুটপাত উচ্ছেদের আগে রাজনৈতিক নেতারাসহ সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ জায়গা নির্বাচন, স্থানান্তর এবং পুনর্বিন্যাসের বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাসেল রহমান বলছেন, ‘পুরোনো পদ্ধতি কাজ করেনি। তাই নতুন পদ্ধতিতে যাওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। সেখানে পুনর্বাসনের বিষয়টি অবশ্যই থাকবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর