রেল দুর্ঘটনা রোধে সারা দেশের পুরনো রেল ক্রসিংগুলোতে ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণের পাশাপাশি আধুনিক অটোমেটিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব।
কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের নিচে রেল ক্রসিংয়ে বাস ও ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহতের ঘটনার পর রোববার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী হাবিব এবং কৃষিমন্ত্রী এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। দুর্ঘটনায় হতাহতদের ব্যাপারে রেল প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন। যাদের চিকিৎসা প্রয়োজন, ঢাকা নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুরনো রেলগেটগুলোতে গেটম্যান নেই, তদারকি নেই; ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, পুরনো যে রেল ক্রসিংগুলো রয়েছে, সেখানে রেল ওভারপাস কিংবা আন্ডারপাস করে দেওয়া যায় কিনা তা যাচাই করতে। আরেকটি সিদ্ধান্ত আলোচনায় রয়েছে, তা হলো রেল ক্রসিংগুলো অটোমেটিক করে দেওয়া যায় কিনা।’
অটোমেটিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে ট্রেন প্রবেশ করলে রেল ক্রসিংয়ের ব্যারিয়ারগুলো যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেমে যায়, সেই অটোমেটিক সিস্টেম নিয়েও আমাদের কাজ চলছে।’
কুমিল্লার দুর্ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক তদন্তে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ায় দুই গেটম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি বিভাগীয় ও একটি জোনাল (আঞ্চলিক) তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্টেশন মাস্টারের কোনো অবহেলা ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত কমিটি হলেও তদন্ত প্রতিবেদন শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে না। সাংবাদিকের এমন বক্তব্যে জবাবে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। তাই জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা রয়েছে। তাই আশা করতে পারেন, এই তদন্ত আলোর মুখ দেখবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কতদিনে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে, এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ‘এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। আমি রেলওয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা এক সপ্তাহের মধ্যে এই প্রতিবেদন জমা দেবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।’
হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, যারা এ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন, তাদের পরিবারকে রেলওয়ের পক্ষ থেকে ১ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে ২৫ হাজার ও আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি জীবনের মূল্য কোনোভাবে এক লাখ টাকা হতে পারে না। সে কারণে যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে এবং রেল দুর্ঘটনা এড়াতে ক্রসিংগুলোর আধুনিকায়ন করতে সরকার ইতোধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রেল দুর্ঘটনা পর অনেক দূর থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন আসার কারণে উদ্ধারকাজে শুরু করতে অনেক দেরি হয়ে যায়। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ বিষয়টির সমাধানে সরকারের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী জানান, এ ধরনের ভোগান্তি কমাতে আরও চারটি রিলিফ ট্রেন (উদ্ধারকারী ট্রেন) কেনা হবে, যাতে উদ্ধারকাজ দ্রুত শুরু করা যায়।
রেলপথের কুমিল্লা অংশে অর্ধশতাধিক রেল ক্রসিং রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সময় নানা আশার বাণী শোনা গেলেও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পর কর্তৃপক্ষের টনক নড়তে দেখা যায়। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের সরকার শপথ নিয়েছে এক মাসের মতো হয়েছে। এরই মধ্যে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটনার আগেই প্রধানমন্ত্রী ক্রসিংগুলোর আধুনিকায়ন, ওভারপাস-আন্ডারপাস নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছে, অর্থাৎ আমাদের সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে, বাস্তাবায়নের চিন্তাভাবনাও আছে।
তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী ঢাকাকে যানজটমুক্ত করার যে পরিকল্পনা নিয়েছেন, তার আওতায় রেল ক্রসিংগুলোর আধুনিকায়ন ও ওভারপাস নির্মাণের বিষয়টিও সমীক্ষা পর্যায়ে রয়েছে। সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের কাজ করছে।
কুমিল্লার পদুয়া বাজারে শনিবার রাতে রেলক্রসিং-এ ট্রেনের ধাক্কায় একটি যাত্রীবাহী বাসের ১২ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। তদের মধ্যে ৭ জন পুরুষ, ২ জন নারী ও তিনজন শিশু। রাত তিনটার দিকে জাঙ্গালিয়া কচুয়ায় পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড রেলক্রসিং-এ এ দুর্ঘটনা ঘটে।


