ঋণখেলাপি সংক্রান্ত কঠোর ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করে আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডকে শতভাগ মার্জিনে আমদানি এলসি খোলার বিশেষ অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
দেশের অন্যতম বড় একটি করপোরেট ঋণখেলাপির সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও আগামী ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই সুবিধা পাবে প্রতিষ্ঠানটি।
সোমবার জারি করা এক সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এর ধারা ২৭কক(৩) এর কার্যকারিতা আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারির ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি বা খেলাপি ঋণের জামিনদার নতুন কোনো ঋণ সুবিধা বা আমদানি এলসি খুলতে পারেন না। তবে এই বিশেষ ছাড়ের ফলে প্রতিষ্ঠানটির কাঁচা চিনি আমদানির আইনি বাধা দূর হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, এই সুবিধা কেবল শতভাগ নগদ মার্জিনযুক্ত আমদানি এলসির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। এ ছাড়া এই সুবিধার কারণে তৈরি হওয়া কোনো দায়দায়িত্ব সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বহন করবে না এবং এলসি সুবিধা দেওয়া ব্যাংকগুলো কোনো আর্থিক সহায়তার দাবি করতে পারবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ২৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আব্দুল মোনেম লিমিটেডের খেলাপির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকেরই পাওনা প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকা।
যদিও আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি সরাসরি এই ঋণ নেয়নি, তবে তারা অগ্রণী ব্যাংকের সেই খেলাপি ঋণের করপোরেট জামিনদার ছিল। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী জামিনদারকেও খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হয়, যার ফলে তারা এলসি খোলার যোগ্যতা হারিয়েছিল।
গ্রুপটি গত বছরের আগস্টে বিশেষ শর্তে ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করে। পরবর্তীতে চলতি বছরের ৭ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের কাছে শতভাগ নগদ মার্জিনে এলসি খোলার অনুমতি চেয়ে আলাদা আবেদন জমা দেয়।
চিনি আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এই অনুরোধ করা হয়েছিল। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের অনুমোদন চেয়ে ১৬ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে চিঠি পাঠায়।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে এলসি খুলতে না পারলে রিফাইনারিটিকে প্রতিদিন প্রায় ২৩ হাজার ডলার জরিমানা গুনতে হতো। তা ছাড়া দেশে সীমিত সংখ্যক চিনি রিফাইনারি পূর্ণ ক্ষমতায় চালু থাকায় সরবরাহ বিঘ্নিত হয়ে বাজারে প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও জানানো হয়।
বর্তমানে আবুল খায়ের লিমিটেড একটি ক্রয় চুক্তির অধীনে এই রিফাইনারিটি পরিচালনা করছে এবং ‘স্টারশিপ সুগার’ ব্র্যান্ড নামে চিনি বাজারজাত করছে, যদিও মালিকানা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা এখনো শেষ হয়নি।
আব্দুল মোনেম গ্রুপ জানিয়েছে, নতুন ক্রেতা হিসেবে আবুল খায়ের গ্রুপ ব্যাংকের ঋণ ও বন্ডের দায়বদ্ধতা পরিশোধের দায়িত্ব নেবে। মালিকানা পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়।
গত ১৮ মাস ধরে ব্যাংকগুলো নতুন কোনো অর্থায়ন না করায় এবং নির্মাণ খাতে মন্দার কারণে গ্রুপটির ব্যবসা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
১৯৫৬ সালে প্রয়াত শিল্পপতি আব্দুল মোনেম এই গ্রুপটি প্রতিষ্ঠা করেন। কয়েক দশকে এটি নির্মাণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পানীয়, ওষুধ ও জ্বালানি খাতে সম্প্রসারিত হয়। ২০০৭ সালে সুগার রিফাইনারিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২০ সালে আব্দুল মোনেমের মৃত্যুর পর গ্রুপটি তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সচল রাখা এবং ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার এই চেষ্টা খাত সংশ্লিষ্টদের মনে নতুন প্রশ্ন জাগিয়েছে, ভবিষ্যতে অন্যান্য খেলাপি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এমন সুযোগ দেওয়া হবে কি না।


