বিএনপিতে প্রবীণ নেতারা ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে পড়ছেন। সরকার পরিচালনায় অনেকে বাদ পড়ার পর দল পরিচালনাতেও পিছিয়ে পড়ছেন তারা। দলের নীতিনির্ধারনী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপেক্ষাকৃত নবীন নেতাদেরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গুঞ্জন আছে, মহাসচিব পদে আসতে চলেছেন বর্তমানের সবচেয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে এরই মধ্যে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শিগগিরই অবসরে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে সাক্ষাৎকারে অবসরের কারণ হিসেবে নিজের বার্ধক্যের কথা জানিয়েছেন তিনি।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, বেশিরভাগ সিনিয়র নেতাকে কৌশলে নিস্ক্রিয় করে ফেলা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হতাশ হয়ে দলীয় কার্যক্রমে নিজেদেরকে গুটিয়ে ফেলছেন।
শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা টাইমস’কে বলেন, ‘পরিস্থিতি এমনই যে, বয়স্কদের অবসরে পাঠাচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান।’
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, দলীয় ফোরামের যেকোনো বৈঠকে চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রবীণ নেতাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত নবীন নেতাদের কথায় বেশি মনোযোগ দেন। বিশেষ করে যারা খালেদা জিয়ার সময় সিনিয়র নেতা হিসেবে প্রভাবশালী ছিলেন, তাদেরকে নিয়ে এক ধরণের অস্বস্তিতে ভোগেন তারেক রহমান।
বিএনপিতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে লন্ডনভিত্তিক নবীন নেতাদের প্রভাবকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন একাধিক নেতা। তাদের মতে, সরকার ও দল পরিচালনায় মাঠের অভিজ্ঞতাবিহীন লন্ডনভিত্তিক নেতারাই এখন তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও প্রধান পরামর্শক। তাদের সঙ্গে যারা ঘনিষ্ঠতা রাখতে পারছেন তারাই সরকারে কিংবা দলে পদ-পদবি পাচ্ছেন।
কয়েকজন নেতা জানান, তারেক রহমানও মনে করেন বিদেশে শিক্ষিত এই নবীন নেতাদের উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল চিন্তাশক্তি প্রবীণ নেতাদের চেয়ে অনেক আধুনিক। রাষ্ট্র সংস্কারে ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নে প্রবীণদের চেয়ে নবীনরাই বেশি কার্যকর বলেও মনে করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
প্রবীণ নেতাদের বিশ্বাস ছিল দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকায় নতুন সরকার পরিচালনায় প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারণ নবীন নেতারা কখনো সরকার পরিচালনার মত কঠিন কাজে অভিজ্ঞতা অর্জনের কোনো সুযোগ পাননি। তাই প্রবীণদের সঙ্গে রেখে তাদেরকে এই অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে। এক পর্যায়ে তারা প্রবীণদের জায়গা নেবেন।
কিন্তু নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর সরকার গঠনের সময় প্রবীণ নেতারা অনেকটাই হতবাক হয়ে যান। মন্ত্রিসভায় পুরনোদের মধ্যে মাত্র কয়েকজনকে ঠাঁই দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রীর মধ্যে মাত্র ছয়জন অতীতে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া দুজন ছিলেন এরশাদ সরকারের আমল প্রতিমন্ত্রী।
নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতো প্রভাবশালী প্রবীণরা। মেজর(অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিলেও তার জন্য বরাদ্দ হয় অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়।
পরবর্তীতে অবশ্য মির্জা আব্বাসকে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু অন্য কয়েকজন উপদেষ্টাকে কোনো না কোনো মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হলেও মির্জা আব্বাসকে কোনো মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে হাফিজউদ্দিন আহমেদকে জাতীয় সংসদের স্পিকার বানানো হলেও তাকে দল থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। আইনগত বা সাংগঠনিক বাধ্যবাধকতা না থাকলেও তাকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।
বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান, চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের মধ্যে নিজের ক্ষমতা নিরংকুশ রাখার জন্যেই প্রবীণ নেতাদের কৌশলে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। তবে আপাতত এই প্রবীণ নেতাদেরকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হবে না। বরং স্থায়ী কমিটির শূন্য পদগুলিতে অপেক্ষাকৃত নবীন নেতাদের নেওয়া হবে। অবশ্য বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় ব্যারিস্টার জমিরউদ্দির সরকার ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে স্থায়ী কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে। অসুস্থতাজনিত কারণে বাদ পড়তে পারেন সেলিমা রহমানও।
এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছরের শেষ দিকে দলের জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এই কাউন্সিলেই দলের মহাসচিব পদটি সালাহউদ্দিন আহমেদকে দেওয়া হবে বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে। এছাড়াও বিভাগীয় সাংগঠনিক পদগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে প্রবীণদের বদলে জায়গা করে নিতে পারেন নব্বই দশকের অনেক ছাত্র নেতা।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দলের কাউন্সিলের জন্য আমাদের কাজ চলছে। আশা করছি এ বছরের শেষের দিকে কাউন্সিল করতে পারবো। কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের বিভিন্ন পদে পরিবর্তন আনা হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে। অনেক দিন তো দলের মহাসচিব পদে ছিলাম। এখন একটা পরিবর্তন দরকার।’ দলের নেতৃত্বে তরুনদের এগিয়ে আসা উচিত বলে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে। আমি কিছুটা অসুস্থ। আমাদের একটা অভিজ্ঞতা আছে ঠিকই। কিন্তু কাজ করবে তরুণরা। তাই দলের নেতৃত্বে তরুনদের এগিয়ে আসা উচিত।’


