আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের পরবর্তী কিস্তি এখন আর কেবল অর্থনৈতিক সূচকের পরীক্ষায় আটকে নেই, বরং তা নির্ভর করছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতের সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে বর্তমান সরকার কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ–এর বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের ওপর।
বিএনপি সরকারের নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন এবং বাস্তব অগ্রগতির ঘাটতি সামনে আসায় জুনের কিস্তি পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। কারণ, আইএমএফ এখন প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান ও স্থায়ী সংস্কারের প্রমাণ খুঁজছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওয়াশিংটনে আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঋণ পাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা না দিয়ে কেবল ‘আশা’ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন প্রকাশ্য ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় কাজ বাকি থাকার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন, যা ইঙ্গিত করে যে সংস্থাটি এখনো সন্তুষ্ট নয়।
নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, আইএমএফ কর্মসূচি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা এবং ফলাফলই মূল বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। আগের কিস্তিগুলোর ক্ষেত্রে আংশিক অগ্রগতি বা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ছাড় মিললেও এখন সংস্থাটি কার্যত কঠোর বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই যাচাই করা হচ্ছে বাস্তবতার মাপকাঠিতে।
চলমান কর্মসূচির আওতায় পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের জন্য রয়েছে একাধিক শর্ত–ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য জলবায়ু নীতিমালা, সরকারি সম্পদের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার এবং সবুজ অর্থায়নে নীতিমালা প্রণয়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগ। তবে আলোচনায় এসব শর্তের সামনে রয়েছে বিগত দিনে বাস্তবায়ন না করা বা আংশিক বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতিগুলো।
বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তোলা, জিডিপির তুলনায় রাজস্ব বাড়ানো, জ্বালানি-সার সহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানো, মার্কিন মুদ্রার বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করা এবং খেলাপি ঋণ কমানোর মতো মূল শর্তগুলো সময়মতো পূরণ হয়নি। যে কারণে এসব বিষয়ে বাংলাদেশের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের সময়সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকার কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানিতে ভর্তুকির চাপ কমাতে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক দেড় মাস বিরতির পর বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে এবং বিনিময় হার একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে সংকেতমূলক হস্তক্ষেপ করেছে।
সাম্প্রতিক ডলার কেনা ও রিজার্ভ বাড়ানোর এই উদ্যোগকেও আইএমএফের শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ওপরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। তারা বলছেন, সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো আইএমএফের কাছে সংকেত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সংস্থাটি এখন ধারাবাহিক ও স্থায়ী সংস্কারের প্রমাণ খুঁজছে যা কেবল বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখন বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমস্যাটা বহুমাত্রিক হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আইএমএফকে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার এসে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে পরিবর্তন এনে পুরনো শেয়ারধারকদের ফেরার সুযোগ তৈরি করেছে, যা সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। ‘বিগত দিনের সংস্কারের মাধ্যমে যে কাঠামো তৈরি হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে নীতিগত বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বদলে যাবে কি না–নীতির এই স্থায়িত্ব নিয়েই আইএমএফের মূল উদ্বেগ’, বলে জাহিদ হোসেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ ও অপসারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই অর্থনীতিবিদ। তার মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে আর্থিক খাতের সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনাতেও দ্বিধার ইঙ্গিত রয়েছে।
‘চুক্তির শর্ত ছিল বিনিময় হার বাজারমুখী করা, কিন্তু এখনো নিয়ন্ত্রণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে,’ বলেন তিনি। একইভাবে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিকতা ভাঙার বিষয়টি তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
২০২৩ সালে আইএমএফের সঙ্গে যেদিন ঋণ চুক্তিতে প্রবেশ করে তখন থেকেই জ্বালানি তেলের দাম নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক বাজার দরের সঙেগ সমন্বয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাংলাদেশ। এই প্রতিশ্রুতি মেনে গত তিন বছর ধরে নিয়মিত সমন্বয় করা হয়েছে জ্বালানির দাম। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে জ্বালানির দাম সমন্বয় হওয়ার কথা ছিল।
জাহিদ হোসেন বলেন, কিন্তু এপ্রিলের শুরুতে জ্বালানির দাম সমন্বয় না হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তনির্ভর হয়েছে বলে মনে করবে আইএমএফ। জ্বালানির মূল্য নিয়ে গত তিন বছর ধরে চলে আসা একটি প্রশাসনিক চর্চা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেছে বর্তমান সরকারের সময়ে।
‘আগামীতে অন্য কোনো সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় যে ছেদ পড়বে না এর নিশ্চয়তা চাইবে আইএমএফ,’ বলেন তিনি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আইএমএফের কিস্তি আটকে গেলে এর প্রভাব শুধু ওই ঋণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ‘বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এআইআইবিসহ অন্যান্য সংস্থা আইএমএফের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে,’ বলেন তিনি।
আইএমএফ ঋণ অনিশ্চিত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈদেশিক বাণিজ্যে। এতে এলসি খোলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গ্যারান্টি লাগতে পারে, বাড়বে লেনদেন ব্যয় এবং চাপে পড়বে আমদানি-রপ্তানি খাত।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যেখানে আইএমএফের ঋণ পাওয়া নির্ভর করছে সরকারের নীতিগত ধারাবাহিকতা, বাস্তব সংস্কার এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।


