গতবছর ‘জুলাই কনসার্ট’ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার। শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি বাতিল হয়ে যায়। তবে এক বছর পার হয়ে গেলেও এই কনসার্টের জন্য তোলা টাকা ফেরত পাননি অর্থদাতারা। এমনকি আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাবও দেওয়া হয়নি।
চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠার পর সালাহউদ্দিন আম্মার কথা দিয়েছিলেন, তিনি খরচের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই হিসাব সামনে না আসায় তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এর মধ্যেই আম্মারকে নিয়ে আরেকটি নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। তিনি ‘নবকালচার’ নামের একটি সংগঠনের পরিচালক। সেই সংগঠন থেকে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত ও বিএনপির কয়েকজন নেতাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডকে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ আখ্যা দিয়ে ক্যাম্পাসে বিলবোর্ড লাগানো হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে জুলাই কনসার্ট আয়োজন করা হয়েছিল। এই কনসার্ট আয়োজনের জন্য বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা তোলেন তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সমন্বয়ক আম্মার। তবে শেষ পর্যন্ত কনসার্টটি আর হয়নি। এরপর আম্মার ঘোষণা দেন, তিনি কনসার্টের জন্য তোলা টাকার সব হিসাব দেবেন। কিন্তু গত এক বছরেও কোনো হিসাব তিনি দেননি।
টাইমস অব বাংলাদেশ-এর কাছে আম্মার স্বীকার করেন, কনসার্টের জন্য তোলা টাকা তিনি ফেরত দিতে পারেননি। তার দাবি, এই টাকার একটা অংশ আগেই অগ্রিম হিসেবে সরঞ্জাম সরবরাহকারী সহ বিভিন্ন পক্ষকে দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। বাকি টাকা দিয়ে ‘আর্ক’ ব্যান্ডকে এনে ছোট একটি অনুষ্ঠান করা হয়।
আম্মার জানান, তিনটি জায়গা থেকে মোট আড়াই লাখ টাকা উঠেছে। কিন্তু হিসাব মেলাতে গিয়ে পরে তার নিজেরই ২ লাখ টাকার মতো দেনা হয়ে যায়। তিনি বলেন, “বিষয়টি এখনো পুরোপুরি মেটেনি, তাই কোনো ব্যাখ্যা দিইনি। ব্যান্ড আর্টসেল আমার কাছে টাকা পায়, আবার আমিও অনেকের কাছে পাব। বিস্তারিত বলার সময় এখনো আসেনি। তবে খুব শিগগিরই ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করে দেব।”
এদিকে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া কিছু কাগজপত্রে দেখা গেছে, কনসার্টের জন্য ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে বিভিন্ন ৭০টি সংস্থায় চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সেই চিঠিগুলোতে ‘জোরালো সুপারিশ’ করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার উপাচার্য সালেহ হাসান নকীব।
আম্মারের মতে, দুই দিনের এই উৎসবের সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছিল ৭০ লাখ টাকা। পরিকল্পনা ছিল রক, ফোক, র্যাপ এবং ইসলামিক গান গাওয়ার ব্যান্ডের পরিবেশনা রাখা হবে। এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া তিনটি পরিবারের জন্য ১৫ লাখ টাকা সাহায্যের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, চিঠিগুলো চাদাবাজির জন্য দেওয়া হয়নি, এগুলো ছিল স্রেফ স্পন্সর পাওয়ার প্রস্তাব।
তিনি আরও জানান, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক ২ লাখ টাকার একটা চেক দিয়েছিলেন, ‘সুলতানস ডাইন’ দিয়েছিল ৩০ হাজার টাকা এবং অন্য এক ব্যক্তি দিয়েছিলেন ২০ হাজার টাকা।
অনুষ্ঠানে বিখ্যাত রক ব্যান্ড ‘আর্টসেল’-এর গান গাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে তারা না করে দেয়। আম্মারের ভাষ্যমতে, সাউন্ড সিস্টেমসহ বেশ কিছু খরচের জন্য আগেই কিছু অগ্রিম টাকা দেওয়া ছিল। পরে আর্টসেল না আসায় ৩ লাখ টাকা খরচ করে ‘আর্ক’ ব্যান্ডকে দিয়ে ছোট একটি আয়োজন করা হয়।
আম্মারের অভিযোগ, রাকসু নির্বাচনে যারা হেরে গেছে, তারা এসব গুজব ছড়াচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি ফাহিম রেজাকে দোষ দিয়ে তিনি বলেন, ফাহিমই এই চাদাবাজির অভিযোগগুলো বড় করে ছড়াচ্ছেন।
তবে ফাহিম রেজা উল্টো জানান, সাবেক এক বিভাগীয় কমিশনারের কাছ থেকেই তিনি প্রথম বিষয়টি জানতে পারেন। ফাহিম বলেন, ‘সাবেক এক বিভাগীয় কমিশনার নিজেই আমাকে বলেছিলেন যে আম্মার নানা জায়গা থেকে জোর করে টাকা তুলছেন।’
তিনি জানান, একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরির টাকার বিষয়ে কথা বলতে গেলে কমিশনার সাহেব তাকে সেই স্পন্সরশিপের চিঠিটি দেখান। পরে ওখানকার কর্মচারীরা তাকে জানান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ এবং কয়েকটি ব্যাংকেও হুবহু একই রকম চিঠি পাঠানো হয়েছে।


