জাতীয় নির্বাচনের তফসিলের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত পরিবর্তন এনেছে সরকার। যেখানে আমলাতান্ত্রিক নিয়োগের সুপারিশের জন্য গঠিত কমিটি বাতিল করা হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রশাসনিক রদবদলের ক্ষমতা কার্যত আমলাতন্ত্রের হাতেই ফিরিয়ে দেওয়া হলো।
এই সিদ্ধান্তের ফলে, বিলুপ্ত হলো উচ্চ পর্যায়ের ‘পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যাফেয়ার্স কমিটি’। গত জানুয়ারিতেই যেটি জেলা প্রশাসক (ডিসি), বিভাগীয় কমিশনার, যুগ্মসচিব এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার সংস্কৃতি বন্ধ করার জন্য গঠন করেছিল সরকার।
এই কমিটি বাতিল করার ফলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয় পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের আগের ভূমিকায় ফিরে এসেছে।
কেন জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটি বাতিল হলো এমন প্রশ্নে জবাবে কমিটির সদস্য বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, কমিটি বাতিল হওয়ার প্রধান কারণ কমিটির সদস্যরা চাচ্চিলেন না যে কমিটিটা আর থাকুক।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো এই ব্যাপারে প্রশ্ন তুলছে, দলীয় পক্ষপাতের প্রশ্ন আসছে আরকি। সেজন্য আমরা নিজেরাই চাচ্ছিলাম না যে এটা থাকুক। এটা হলে এই দল আপত্তি করে, ওটা হলে ওই দল আপত্তি করে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠছিল।’
পুরোনো নীতিতে ফিরে যাওয়ার ফলে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা ফের অনেকটাই আমলোদের হাতে চলে গেল বলে স্বীকার করলেন এই উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘এখন আগের মতো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সচিবেব মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পদোন্নতি ও বদলির বিষয়গুলো দেখবে। যার তত্ত্বাবধান করবেন প্রধান উপদেষ্টা। অর্থাৎ প্রাথমিক যাচাই বাচাইয়ের কাজ চলে গেল আমলাদের হাতেই।’
নতুন জেলা প্রশাসক বাছাই চলছে
নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি জেলায় পদায়নের জন্য উপযুক্ত প্রার্থীদের তালিকা সংক্ষিপ্ত করতে মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করেছেন। যাদের বেশিরভাগই ২৯তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কমিটি ১৩১ কর্মকর্তাকে তালিকাভুক্ত করেছে। যাদের শিগগিরই ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছাড়াও কমিটিতে রয়েছেন সদস্য সচিব হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহসানুল হক এবং সদস্য হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ।
কমিটি অকার্যকর বিবেচিত
লোকপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমলাতান্ত্রিক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা আনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত বিশেষ কমিটি কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের মতে, এই কমিটির বিলুপ্তি করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার অর্থ হলো আমলাতন্ত্রকে আগের মতোই চলতে দেওয়া।
বর্তমানে ৬৪টি জেলার বেশিরভাগ জেলা প্রশাসক ২৪, ২৫ ও ২৭তম বিসিএসের। তাদের মধ্যে অন্তত ১৬ জন এরই মধ্যে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেলেও আগের প্রশাসনিক পদেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটিটি গঠিত হয়েছিল গত বছরের ৯ জানুয়ারি। অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের এই কমিটিতে ছিলেন বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাউজুল কবির খান, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ এবং লোকপ্রশাসন সচিব। নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করলে, বর্তমান তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার স্থলাভিষিক্ত হন।
এই কমিটির দায়িত্ব ছিল জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে পরামর্শ দেওয়া। এই কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দিত জনপ্রশাস মন্ত্রণালয়।
তবে ২৯ অক্টোবর সরকার এই কমিটি বিলুপ্ত করে এবং সেদিন থেকেই নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের সাক্ষাৎকার শুরু হয়।
‘নিরপেক্ষ’ পোস্টিং নিয়ে রাজনৈতিক চাপ
গত কয়েক মাস ধরেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে মাঠ প্রশাসনে ‘নিরপেক্ষ’ কর্মকর্তাদের পদায়ন নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছিল। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে তারা এটাও বলেছেন যে, দলীয় লোক নিয়োগ নির্বাচনের মাঠকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টা তাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সমস্ত পদায়ন তদারকি করবেন।
কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, এত বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগে প্রতিটি ঘটনা খতিয়ে দেখা প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে কতটুকু সম্ভব বা কতটুকু বাস্তবসম্মত।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাছাই এবং সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরির ক্ষমতা আসলে আমলাদের হাতেই ফিরে গেছে।
ফাওজুল কবির খান বলেন, মন্ত্রিপরিষদ ও জনপ্রশাসন সচিবদের কাছে আসা বিপুল সংখ্যক পদোন্নতি ও বদলির বিষয়গুলো সামাল দেওয়ার জন্যই প্রাথমিকভাবে কমিটিটি তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য ভালো ছিল এবং আমরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছি।’
মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ বলেন, কমিটির সদস্যদের নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত আসায় উপদেষ্টারা অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেছিলেন।
‘আমাকে ওপর মহল থেকে এটি বিলুপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছে’, বলেন তিনি।
আমলারা কী নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছেন, এই প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা সবসময় আমলাতন্ত্রের হাতেই থাকে। এতে কেউ লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আমি মনে করি না।’
পুরোনো ব্যবস্থায় ফেরাকে বিশেষজ্ঞদের স্বাগত
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এর ফলে বেসামরিক প্রশাসনকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল তা এড়ানো গেছে।
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোক প্রশাসন কেন্দ্রের প্রাক্তন রেক্টর একেএম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলছেন, এমন কমিটি গঠনের ঘটনা নতুন না। বিএনপির শাসনামলে খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছিল। খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় তার কাছে অনেকে দাবি নিয়ে যাওয়ার সাহস পায়নি। দাবি নিয়ে যারা যেতেন তারাও বিএনপির ছিলেন। ফলে, খুব একট সমস্যা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে বিএনপি ও জামায়াতসহ নানা রাজনৈতিক শক্তি সমান তালে প্রতিযোগিতা করছে। এই কমিটি করা হয়েছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিযোগ ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু দেখা গেল এই কমিটি করার পরও অভিযোগ খুব একট কমেনি।’
মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ যাদের সঠিক তথ্য প্রধান উপদেষ্টার কাছে তুলে ধরার কথা তারা যদি তা তুলে ধরেন তাহলে কমিটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত ভালো হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এই কমিটি কাজ করতে পারল না। ফলে, নির্বাচনের আগে মাঠ প্রশাসনে জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা আবার আমলাদের হাতে চলে গেল। এক অর্থে বলতে পারেন ক্ষমতা আমলাদের হাতে চলে গেল। কারণ, প্রধান উপদেষ্টাদের কাছে আমলারা যেভাবে তথ্য দেবেন তার বাইরে তো উনার দেখার সময় নেই। তবে চাইলে উনি একটা ক্রসচেক করতে পারেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান বলেন নির্বাচনের আগে সব দলই তাদের পছন্দের কর্মকর্তা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চাওয়াটা সরকারের ভেতরেও সমস্যা তৈরি করছে।
তিনি বলেন, ‘র্নিবাচনের আগে মাঠ প্রশাসনে ডিসি নিয়োগ নিয়ে শুধু রাজনৈতিক দলের মধ্যো না সরকারের মধ্যেও ঝামেলা চলছে। কারণ দেয়ার ইজ নো রাইট ওয়ে ইন দিস পলিটিক্যাল সিচুয়েশন। সরকারের উচিৎ হবে কারো কথা না শুনে শুধু পারর্ফমেন্সের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া।’


