বাজার কারসাজি: শবনম অয়েলকে ৩২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা জরিমানা

বাজার কারসাজি: শবনম অয়েলকে ৩২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা জরিমানা
ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

ভোজ্যতেলের বাজারে সরবরাহ সীমিত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার অভিযোগে শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ৩২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন।

কমিশনের মতে, প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করেছে, যার ফলে ভোক্তাদের উচ্চমূল্যে ভোজ্যতেল কিনতে হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কমিশন জানায়, ২০২২ সালে ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে শুরু হওয়া তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। দীর্ঘ তদন্ত ও শুনানি শেষে কমিশন এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

অভিযোগ

২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে পাম অয়েল ও সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়ে। তবে একই সময়ে দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের ঘাটতি, সরবরাহ সংকট এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ওঠে।

এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন তদন্ত শুরু করে।

তদন্তে কমিশন দেখতে পায়, বাজারে সরবরাহ সংকটের যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছিল, বাস্তবে তার পেছনে উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার কিছু অস্বাভাবিকতা ছিল। বিশেষ করে বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাজার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তদন্তে যা পেয়েছে কমিশন

কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ ডিলারদের নামে সরবরাহ আদেশ (সাপ্লাই অর্ডার) ইস্যু করলেও অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করেনি। এর ফলে বাজারে প্রকৃত সরবরাহ কমে যায় এবং কৃত্রিম সংকটের পরিবেশ তৈরি হয়।

আরও পড়ুন

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি সরবরাহ আদেশ ব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিচালনা করেছে, যার মাধ্যমে বাজারে পণ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। কমিশনের মতে, এটি কার্যত সরবরাহ সীমিত করার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সময়ে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও প্রতিষ্ঠানটি তার উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করেনি। কমিশনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উৎপাদন ও সরবরাহ উভয় ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় বাজারে ভোজ্যতেলের প্রাপ্যতা কমে যায়।

কৃত্রিম সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির যোগসূত্র

কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরবরাহ সীমিত হয়ে গেলে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এর ফলে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে থাকে এবং ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে, সরবরাহ আদেশের মাধ্যমে বাজারে পণ্য আটকে রাখা এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না করার ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছিল। এ সংকট পরবর্তীতে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

প্রতিযোগিতা কমিশনের মতে, এ ধরনের আচরণ শুধু ভোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতাও ব্যাহত করে। কারণ বাজারের অন্য অংশগ্রহণকারীরা সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন এবং মূল্য নির্ধারণে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট হয়।

আইনের যে ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে

কমিশন বলেছে, শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকাণ্ড প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর ধারা ১৫-এর আওতায় নিষিদ্ধ কার্যকলাপের মধ্যে পড়ে।

আইন অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদন, সরবরাহ, বাজার বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে এমনভাবে সীমিত করতে পারে না, যা বাজারে প্রতিযোগিতা হ্রাস করে বা ভোক্তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে।

কমিশনের মতে, শবনম ভেজিটেবল অয়েল উৎপাদন ও সরবরাহ সীমিত করার মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং এর মাধ্যমে আইনের লঙ্ঘন ঘটেছে।

৩২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা জরিমানা

তদন্ত ও শুনানি শেষে কমিশন প্রতিষ্ঠানটির ওপর ৩২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার আর্থিক জরিমানা আরোপ করেছে।
কমিশন জানিয়েছে, জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির গত কয়েক বছরের আর্থিক তথ্য, বাজারে অবস্থান এবং অভিযোগের প্রকৃতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

তবে আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ পাবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad