সাপ আতঙ্কে নির্ঘুম সাহারবাটি, ওঝার ঝাড়ফুঁকে প্রতারণা

সাপ আতঙ্কে নির্ঘুম সাহারবাটি, ওঝার ঝাড়ফুঁকে প্রতারণা
Advertisement
Advertisement

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সাহারবাটি গ্রামে এখন সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসে আতঙ্ক। গ্রামের মানুষের দাবি, গত এক সপ্তাহে শতাধিক মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়েছেন। এরই মধ্যে সাপের কামড়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জুই খাতুনের মৃত্যুর ঘটনা পুরো গ্রামজুড়ে ভয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে আশ্চর্যের বিষয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেউ সাপ দেখেননি। আতঙ্কের এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন গ্রামের ওঝারা। অন্যদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, সাপে কাটলে ওঝা নয়, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে অধিকাংশ রোগীকেই বাঁচানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে মেহেরপুরের তিনটি হাসপাতালে সাপের কামড়ের ১৩৪ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকদের দাবি, অধিকাংশ রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানোর কারণেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপে কামড়ালে আক্রান্ত অঙ্গ নাড়াচাড়া কমিয়ে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। ঝাড়ফুঁক, হাত চালান বা কুসংস্কারে বিশ্বাস করে সময় নষ্ট করলে মৃত্যুঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তাই আতঙ্ক নয়-সচেতনতা ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর আস্থা প্রয়োজন।

সাহারবাটি গ্রামের জুই খাতুন ছিল সপ্তম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী। তার দাদি পাখিজান খাতুন জানান, গত ১২ জুলাই গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে সাপে কামড় দেয়। রাত তিনটার দিকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে পরিবারের কিছু সদস্যের পরামর্শে সেখান থেকে তাকে ওঝার কাছে নেওয়া হয়। হাসপাতাল ও ওঝার কাছে নেওয়া-আনার সময় নষ্ট হতে হতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পার হয়ে যায়। পরে হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত জুইকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

জুইয়ের মা শান্তনা খাতুন জানান, ‘সাপে কাটার পর আমরা খুব ভয় পেয়ে যাই। হাসপাতালে নিয়েছিলাম, পরে গ্রামের লোকজনের কথায় ওঝার কাছেও নিয়ে যাই। এখন মনে হয় সময় নষ্ট না করলে হয়তো মেয়েটাকে ফিরে পেতাম।’

তিনি আরও জানান, ‘আমরা বুঝতে পারিনি কী করা উচিত। সবাই বলছিল ওঝার কাছে নাও। এখন শুধু আফসোস ছাড়া আর কিছুই নেই।’

তবে জুইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ মানতে নারাজ স্বাস্থ্য বিভাগ।

আরও পড়ুন

মেহেরপুর গাংনী উপজেলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ একরামুল হক জানান, রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে আনা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পরে আবার ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়ায় মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে। সাপের বিষক্রিয়ায় সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত অ্যান্টিভেনম দেওয়া গেলে অনেক রোগীকে বাঁচানো সম্ভব।

জুইয়ের মৃত্যুর পর থেকেই সাহারবাটি গ্রামে শুরু হয়েছে অদ্ভুত এক সাপ আতঙ্ক। গ্রামবাসীর দাবি, প্রতিদিনই কেউ না কেউ সাপের কামড়ের শিকার হচ্ছেন। অনেকেই হাসপাতালে না গিয়ে প্রথমেই ছুটছেন গ্রামের ওঝাদের কাছে।

সাপ কাটা রোগী  শাহীন আলী জানান, ‘রাতে মনে হলো কিছু একটা কামড় দিয়েছে। ভয় পেয়ে প্রথমে ওঝার কাছে যাই। পরে হাসপাতালে গেছি।’

আরেক সাপে কাটা রোগী রাব্বানী জানান, ‘আমাকে সবাই বলল ওঝা দেখে দেবে। তাই আগে সেখানে গিয়েছিলাম। পরে ডাক্তার দেখিয়েছি।’

গ্রামের শিক্ষক ইয়াছিন আলী জানান, ভয়ই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুইয়ের মৃত্যুর পর মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ একটু ব্যথা পেলেও মনে করছে সাপে কামড় দিয়েছে। ফলে মানুষ চিকিৎসকের বদলে ওঝার কাছে বেশি যাচ্ছে।

এই আতঙ্ককে পুঁজি করে চলছে ওঝাদের নানা কর্মকাণ্ড। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক ব্যক্তিকে সাপে কাটা রোগী পরিচয়ে নিয়ে যাওয়া হলে ওঝা বিভিন্ন ধরনের ঝাড়ফুঁক ও হাত চালান করেন। কাঁচের গ্লাস শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভিনয় করেন। পরে ওঝা জানান, সাপ কামড়ালেও শরীরে কোনো বিষ নেই।

এভাবেই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

ওঝা ইয়াছিন আলী জানান, ‘আমরা দোয়া-দরুদ পড়ে চিকিৎসা করি। আল্লাহর রহমতে অনেক মানুষ ভালো হয়ে যায়।’

তবে চিকিৎসক ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঝাড়ফুঁক বা হাত চালানের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান জানান, কোরআন-সুন্নাহ মানুষকে চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করেছে। সাপে কামড়ালে ওঝার কাছে নেওয়া বা ঝাড়ফুঁক ইসলাম সমর্থন করে না। রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক কাজ।

এদিকে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মতে, সাহারবাটিতে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার পেছনে মানসিক আতঙ্কও বড় কারণ।

মেহেরপুর সিভিল সার্জন ডা. এ.কে.এম. আবু সাঈদ জানান, একজনের মৃত্যুর পর পুরো এলাকায় ভয় ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিষধর সাপের কামড় নয়, আতঙ্ক থেকেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তবে যে কোনো সাপের কামড়কে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে আসতে হবে। ওঝার কাছে নেওয়ার সময় নষ্ট করা যাবে না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad