গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে বাংলাদেশের অনেক মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। এরপর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিলে বহু মানুষ এটা বিশ্বাস করেছিলেন যে, এই রাষ্ট্র অন্তত নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে সম্মান দেখাবে।
বিশেষ করে বাকস্বাধীনতার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি জনসাধারণকে আশ্বস্ত করেছিল। তারা ভেবেছিলেন, শেখ হাসিনার আমলে দেখা স্বৈরাচারী শাসনের অন্ধকার দিনগুলো বুঝি আর ফিরে আসবে না।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সাধারণ মানুষের সেই আশা ম্লান হতে বেশি সময় লাগেনি।
আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি, তারা প্রায়ই আলোচনা করতাম যে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর নেতৃত্বে পরিচালিত প্রশাসনের অধীনে আগের সরকারের আমলে দেখা দমন-পীড়ন, ভয় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হবে না।
তবে, সময় যত পেরিয়েছে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এমন এক বাস্তবতা যা আদতে বেদনাদায়ক।
যে সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাদেরকেই ধীরে ধীরে সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যেতে দেখা যাচ্ছে। আর এই সরে যাওয়া কেবল রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের মতো সাধারণ বিষয় নয়; বরং এটি বিশ্বাস এবং শপথের মাধ্যমে দেশের মানুষকে দেওয়া আশ্বাসের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
সরকার বারবারই বলছে যে দেশে গণমাধ্যম স্বাধীন এবং সাংবাদিকরা কোনো বাধা ছাড়াই কাজ করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা বলছে অন্য গল্প।
আগের মতোই স্বৈরাচারী কৌশল অনুসরণ করে মামলা দেওয়া হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং সাংবাদিকদের হয়রানি অব্যাহত রয়েছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীরের ঘটনা এই বাস্তবতাই তুলে ধরেছে। তার সঙ্গে যা ঘটেছে তা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি গোটা সাংবাদিক সমাজ এবং প্রকৃতপক্ষে, পুরো জাতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
এই বাস্তবতায় একটি অনিবার্য প্রশ্ন উঠেছে। আর সেটি হলো, রাষ্ট্র এখন কোন পথে হাঁটছে?
যে অন্তর্বর্তী সরকার একসময় ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছিল, তারাই এখন রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে। আর এই ভয় কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি গ্রেপ্তার, রিমান্ড এবং মামলার ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছে।
ইতিহাস আমাদের শেখায়, ভয় দিয়ে শাসনের চেষ্টা করলেই একনায়কতন্ত্রের পদধ্বনি শোনা যায়। আর সেই শাসনের প্রথম শিকার প্রায় সব সময়ই হয় সাংবাদিকরা।
আনিস আলমগীর একজন পরিচিত সাংবাদিক, যার মতামতের সঙ্গে অনেকেরই দ্বিমত থাকতে পারে। গণতন্ত্রে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভিন্নমত সহ্য করতে না পেরে তাকে আটক করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো কালো আইনের মামলায় জড়ানো এবং রিমান্ডে নেওয়া নতুন বাংলাদেশের জন্য এক অস্বস্তিকর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, এটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়।
এই দেশে রিমান্ড মানে কী, তা আমাদের অজানা নয়। জিজ্ঞাসাবাদের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের দীর্ঘ ইতিহাস এই দেশে আছে, যা রাষ্ট্র নিজেই অস্বীকার করতে পারে না।
ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি, দল বা মতের সমালোচনা করলেই যদি একজন সাংবাদিককে তুলে নেওয়া হয়, তাহলে সেটি কী বার্তা দেয়? রাষ্ট্র যখন ভিন্নমত দমনে আইন ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে, তখন সেটিকে আর সুশাসন বলা যায় না। সেটিকে এক ধরনের আধুনিক স্বৈরাচারের রূপকল্প বলতে হচ্ছে, যেখানে ভিন্নমতকে অপরাধে পরিণত করা হয়।
আদালতে দাঁড়িয়ে আনিস আলমগীর যা বলেছেন, তা একজন সাংবাদিকের আত্মপরিচয়ের সরল উচ্চারণ।
আনিস বলেছেন, তিনি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেন, সেটাই তার কাজ। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই কাজই করে আসছেন। তার বক্তব্য প্রকাশ্যে, সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে গোপন কিছু নেই। তিনি যা বলেছেন, তা তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মতামত।
কেন নিজের মত প্রকাশের জন্য তাকে যেতে হলো কারাগারে, এই প্রশ্নই আজ সমাজকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের মানুষ এখনো আশা ছাড়েনি। তারা বিশ্বাস করতে চায়, অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত সাংবাদিক নিপীড়নের পথ ছেড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করবে। কারণ এই অঙ্গীকার করেই তো সরকারটি দায়িত্ব নিয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে, তাতে জনমনে এক গভীর সন্দেহ জন্ম নিচ্ছে। এই সরকার কি সত্যিই নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রের পথে ফিরতে চায়, নাকি নানা কৌশলে ক্ষমতার সময় বাড়ানোর চেষ্টা করছে?
ব্যক্তিগত জীবনে আনিস আলমগীর ও মোস্তফা সারোয়ার ফারুকি দুজনই আমার পরিচিত। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন, মতাদর্শ বিপরীত। তবু ভিন্নমতকে সম্মান করাই তো সভ্যতার পরিচয়। রাষ্ট্র যখন ফারুকির সিনেমা আটকে দেয়, তখন যেমন প্রতিবাদ করা প্রয়োজন, তেমনি আনিস আলমগীরের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জরুরি।
মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে তো কোনো দ্বৈতনীতি চলে না।
এই সরকার যদি সত্যিই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন দিয়ে সরে যেতে চায়, তাহলে এখনই তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা জনগণের মতামতকে সম্মান করে। গণমাধ্যমের শ্বাসরোধ করার নজির রেখে কোনো বিদায়ী সরকারই ইতিহাসে সম্মান পায়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই সরকার কী নিজের অজান্তেই নিজেকে ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
আজকের বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। সেখানে একজন সাংবাদিকের মতামত সহ্য করতে না পেরে তাকে কারাগারে পাঠানোর অর্থই হচ্ছে রাষ্ট্র নিজেই নিজের ওপর আস্থা রাখছে না।
এটি আসলে শক্তিশালী শাসনের লক্ষণ নয়, সরকারের দুর্বলতার প্রকাশ।
আজ গণমাধ্যম ও জনগণ একসঙ্গে প্রশ্ন তুলছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার কী সত্যিই মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারে বিশ্বাসী? নাকি তারাই নতুন এক স্বৈরাচারী বাস্তবতার বীজ বুনছে?
এই প্রশ্নের উত্তর অন্তর্বর্তী সরকারকেই দিতে হবে তার কাজ দিয়ে, কথা দিয়ে নয়।


