অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০২৫ সালে দেশে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে ৭৪৮টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।
সোমবার এই তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানিয়েছে, দেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা একটি গভীর জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।
রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র-২০২৫’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে সংগঠনটি।
সংগঠনের সিনিয়র প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান জানান, ১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনার ভিত্তিতে এই সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে।
তবে শুধু ধর্ষণ নয়, নারী ও শিশুদের ওপর সামগ্রিক নির্যাতনের চিত্রেও রয়েছে ভিন্নতা। সমীক্ষা বলছে, এক বছরে দেশে নারী ও শিশুদের ওপর মোট নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে ২ হাজার ৮০৮টি, যা ২০২৪ সালে ছিল ২ হাজার ৫০৫টি।
মহিলা পরিষদের সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজনৈতিক মদদ, প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতা, পক্ষপাতদুষ্টতা এবং নানামুখী চাপের কারণে সময়মতো অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার সামাজিক প্রবণতা এবং দীর্ঘায়িত বিচারপ্রক্রিয়ার সুযোগে প্রমাণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধিকেও অপরাধীর দায়মুক্তির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংগঠনটি।
সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা সালিশের মাধ্যমে সামাজিকভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এক বছরে যৌন হয়রানির ৪০ শতাংশ, একক ধর্ষণের ৮ শতাংশ এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের ৭ শতাংশ ঘটনা সালিশের মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
সমীক্ষায় বলা হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের হাতেই নারী ও শিশুরা নির্যাতিত হয়েছেন। অর্থাৎ বয়স নির্বিশেষে নারী ও কন্যারা প্রায় কারও কাছেই নিরাপদ নন।
সমীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, এক বছরে স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন ৩৮ শতাংশ নারী। এ ছাড়া প্রতিবেশীর মাধ্যমে একক ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে যথাক্রমে ২৫ ও ৩৪ শতাংশ। শিক্ষকদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির ঘটনা ১৯ শতাংশ।
সন্ত্রাসী, বখাটে ও কিশোর গ্যাংয়ের দ্বারা দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ২২ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, জবাবদিহি এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।
মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম জানান, ছয় বছরের শিশু থেকে ষাটোর্ধ্ব নারী—জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই নারীরা সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। বিশেষত ছয় থেকে নয় বছর বয়সী কন্যাশিশুদের ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি হওয়াকে তিনি সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, পাশাপাশি ধর্ষণের সঙ্গে হত্যার ঘটনাও বেড়ে চলেছে। এটি সামগ্রিকভাবে সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিকতার সংকটকেই সামনে নিয়ে আসছে।


