মৌলভীবাজার জেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে লোকালয়ে চলে আসছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। বনাঞ্চলের আয়তন কমে যাওয়া, খাদ্য ও পানির সংকটে এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রাণীরা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে।
বন বিভাগ বলছে, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বনাঞ্চলের সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি ও খাদ্য-জলাভাব বন্যপ্রাণীদের লোকালয়ে প্রবেশের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব কারণে এ অঞ্চলের বণ্যপ্রাণীরা বন থেকে বেড়িয়ে ক্রমশ লোকালয়ের দিকে চলে আসছে। আগে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে এসব প্রাণী হত্যা করত। তবে বর্তমানে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। লোকালয়ে বন্যপ্রাণী দেখা গেলে বনবিভাগ বা প্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠনগুলোকে খবর দেওয়া হয়।
শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, ‘মানুষ আগের মতো ভয় পেয়ে প্রাণী মারে না। তারা আমাদের খবর দেয়, আমরা প্রাণীগুলোকে উদ্ধার করে বনাঞ্চলে ফিরিয়ে দিই।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘লাউয়াছড়া ক্ষুদ্র ও খণ্ডিত হয়ে গেছে। বন উজাড়ের ফলে তৃণভোজী প্রাণীরা খাদ্য সংকটে পড়ে, ফলে তারা লোকালয়ে চলে আসে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ ও বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. নাসরিন সুলতানা বলেন, ‘ছড়া ও জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় প্রাণীরা নিরাপদ পানির উৎস হারাচ্ছে। খাদ্য ও পানির সংকটই তাদের মানুষদের নিকট আনে।’
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) বাংলাদেশের প্রোগ্রাম উপদেষ্টা এম. জিয়াউল হক বলেন, ‘বন খণ্ডিত হলে প্রাণীর চলাচলের করিডর বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষুধা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা মানুষের কাছে চলে আসে।’
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন লোকালয় থেকে মোট ১৩৮টি বন্যপ্রাণী ও পাখি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা প্রাণী লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাইল হাওরসহ বিভিন্ন বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে।
বনবিভাগের হিসাব অনুযায়ী উদ্ধার করা প্রাণীর মধ্যে রয়েছে দুইটি তক্ষক, তিনটি গন্ধগোকুল, দুইটি লজ্জাবতী বানর, দুইটি অজগর সাপ, তিনটি ঘুঘু, তিনটি বানর, আটটি ময়না, ৩৩টি গো শালিক, পাঁচটি শালিক, তিনটি টিয়া, একটি চিত্রা হরিণ, একটি ঈগল, একটি ভুবন চিল, একটি ব্রাউন পেঁচা, একটি পদ্মগোখরা সাপ, একটি গোমাধিক ও একটি নিশিবক।
এছাড়া, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন লোকালয়ের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করেছে ৬৭টি বন্যপ্রাণী। তাদের হাতে উদ্ধার হওয়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ২৩টি অজগর সাপ, নয়টি লজ্জাবতী বানর, ছয়টি গন্ধগোকুল, চারটি বনবিড়াল, চারটি শঙ্খচিল, তিনটি বেত আঁচড়া সাপ, দুইটি দাঁড়াশ সাপ, দুইটি সবুজ ফনিমনসা সাপ, একটি বেজি, একটি লহ্মীপেঁচা, একটি নীলকণ্ঠ পাখি, একটি ঘরগিন্নী সাপ, একটি ভুবন চিল, একটি সবুজ বোরাল সাপ, একটি সোনা গুঁইসাপ, একটি সুন্ধি কচ্ছপ, একটি জুনিয়া সাপ, একটি পদ্মগোখরা সাপ, একটি শিয়াল, একটি উল্টা লেজি সিংহ বানর, একটি জংলিপেঁচা ও একটি ভোঁদড়।
এর মধ্যে দু’টি গন্ধগোকুল, একটি বনবিড়াল, দুইটি লজ্জাবতী বানর ও একটি ভোঁদড় মারা যায়। মৃত প্রাণীগুলোর বিষয়ে বনবিভাগকে অবহিত করার পর মাটিচাপা দেওয়া হয়।
শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হক বলেন, ‘উদ্ধার ও পুনর্বাসনে বনবিভাগ ও স্বেচ্ছাসেবীরা একসঙ্গে কাজ করছে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিরল ও বিপন্নপ্রায় প্রাণীকে বনে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন উজাড় ও দখল বন্ধ করতে হবে, দেশি ফলজ ও অন্যান্য বনজ গাছ পুনরায় রোপণ করতে হবে, প্রাণীর চলাচলের করিডর সংরক্ষণ করতে হবে, জলাধার ও ছড়ার পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং অপরিকল্পিত রিসোর্ট ও স্থাপনা নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
না হলে ভবিষ্যতে মানুষ–বন্যপ্রাণীর সংঘাত আরও বাড়বে বলেও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২৫ সালে মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন লোকালয় থেকে উদ্ধার করা ১৩৮টি বন্যপ্রাণী ও পাখি নিরাপদে বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে।


