সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীরের পাঁচ দিনের রিমান্ড আদেশ দিয়েছে আদালত।
সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৬ মিনিটের দিকে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক মুনিরুজ্জামান সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
এদিন বিকাল ৫টা ৮ মিনিটে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একটি সাদা হাইস গাড়িতে করে আনিস আলমগীরকে আদালতে আনা হয়। প্রথমে তাকে হাজতে রাখা হয়। পরে বিকাল ৫টা ২৮ মিনিটে হাজত থেকে পুলিশের কড়া নিরাপত্তায় তাকে বের করা হয়।
এরপর সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে আদালতের পাঁচ তলায় নেওয়া হয়। এ সময় তার বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হাতে হাতকড়া এবং মাথায় হেলমেট পরানো ছিল। বিকাল ৫টা ৩৪ মিনিটে তাকে কাঠগড়ায় তোলা হয়।
পুলিশ হেলমেট খুলে দিলে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে কান্না করতে দেখা যায়। তার আইনজীবীরা তখন তাকে ধৈর্য্য ধরতে বলেন এবং কান্না থামানোর চেষ্টা করেন।
এক পর্যায়ে তিনি হাতকড়া পরা অবস্থায় দুই হাত জোড় করেন। তখন তার আইনজীবীরা তার হাত নামিয়ে দিয়ে বলেন, কিছু হবে না; ধৈর্য্য ধরুন।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘সাংবাদিকতার আড়ালে আনিস আলমগীর কুচক্রী মহলের সঙ্গে জড়িত এবং দেশদ্রোহী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত। তিনি উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।’
অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘আনিস আলমগীর একজন প্রকৃত সাংবাদিক। দেশের বাইরেও তার খ্যাতি রয়েছে। তিনি সাংবাদিক হিসেবে ইরান ও ইরাক যুদ্ধ কভার করেছেন। তিনি শুধু সাংবাদিক নন, একজন শিক্ষকও। তিনি নিয়মিত বই লেখেন। টকশোতে তিনি যা বলেন, অতীতেও তার চেয়েও বেশি কথা বলেছেন। কথা বলা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হয়েছে কথা বলার অধিকারের জন্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে উদ্দেশ্য ছিল, সেটি বাস্তবায়ন করাই তার লক্ষ্য।’ তিনি রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতা করেন।
আদালতের অনুমতি নিয়ে আনিস আলমগীর নিজে বক্তব্য দেন। তিনি জানান, তিনি একজন সাংবাদিক। যুদ্ধে তালেবানরা তাকে গ্রেপ্তার করেছিল, তখনো তিনি ভয় পাননি। মৃত্যু ভয় তাকে আর তাড়াতে পারে না। তিনি খালেদা জিয়ার আমলে প্রশ্ন করেছেন, শেখ হাসিনার আমলেও করেছেন, এখনো করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। একটি নির্দিষ্ট দল তাকে তাদের গোলাম বানাতে চায়, কিন্তু তিনি তাদের হালুয়া রুটি খাবেন না। সাংবাদিক হিসেবে তার কাজ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং তিনি তা করেই যাবেন।
তিনি আরও জানান, সমাজে প্রতিহিংসার রাজনীতি ঢুকে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে তা চলতে থাকবে। তিনি জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ১৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগের ডাকা লকডাউন নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। এখানে যাদের নিয়ে কথা বলা হয়েছে, শাওন ছাড়া অন্য কাউকে তিনি চেনেন না বলেও উল্লেখ করেন।
আদালতে আনিস আলমগীর বলেন, ‘ইউনূস যদি চায়, সারা দেশকে কারাগার বানিয়ে দিতে পারে, দেশকে দোজখ বানিয়ে দিতে পারে।’
তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। তিনি যে কথাগুলো বলেছেন, তা কোনো কারণ ছাড়া নয়, বরং প্রেক্ষাপট থেকে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘দুজন ব্যক্তি বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। একজন প্যারিসে থাকেন, অন্যজন নিউইয়র্কে। তারা নির্বাচন বানচাল করতে চায় এবং ভিউ ব্যবসা করে। এই দুই ব্যক্তি একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করে।’ তারা ইউনূস সরকারের কাছে অভিযোগ করতে তাকে ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, ‘আসামির বক্তব্য আগ্রাসী। তিনি মানুষের জানমালের ক্ষতির জন্য আওয়ামী লীগের কর্মীদের উসকানি দিচ্ছেন। এটি পরিকল্পিত ও উসকানিমূলক বক্তব্য। বক্তব্য দেওয়ার অনেক ধরন আছে। অনেকেই বক্তব্য দিয়েছে, কিন্তু সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।’
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আনিস আলমগীরকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।
এর আগে, রোববার ঢাকার ধানমন্ডির ২ নম্বর এলাকার একটি জিম থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়।
পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। একই রাতে জুলাই রেভ্যুলেশনারি অ্যালায়েন্সের কেন্দ্রীয় সংগঠক আরিয়ান আহমেদ অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনসহ চারজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন মারিয়া কিসপট্টা এবং ইমতু রাতিশ ইমতিয়াজ।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লেও তার অনুসারীরা বিভিন্ন কৌশলে দেশে অবস্থান করে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল ও অবকাঠামো ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
আসামিরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনের টকশোতে নিষিদ্ধ সংগঠনকে ফিরিয়ে আনার গুজব ছড়াচ্ছে।
এর মাধ্যমে তারা আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। এসব কার্যকলাপের ফলে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা উসকানি পেয়ে রাষ্ট্রবিরোধী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।


