অন্তর্বর্তী সরকারের ‘মানবপাচার ও অভিবাসী পাচার প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ ২০২৫’- এ পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো। বাংলাদেশ থেকে প্রতারণামূলক ভিসা আবেদন ও অবৈধ অভিবাসন রোধে নতুন এই অধ্যাদেশ ২০১২ সালের মানবপাচার সংশ্লিষ্ট আইনের সংস্কৃত রূপ।
এতে জাল নথির মাধ্যমে অভিবাসী পাচারসহ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের অপরাধকে কঠোরভাবে দণ্ডনীয় করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে ইতালি, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডস। বুধবার প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর কার্যালয়ে এক বৈঠকে দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা অধ্যাদেশটির প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানান।
তাদের সঙ্গে আলোচনায় ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি ধারণা ছিল, বাংলাদেশ ভিসা আবেদনে জাল নথির ব্যবহার রোধে যথেষ্ট কঠোর নয়। এর ফলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে এবং ভিসা প্রক্রিয়াকরণে বিলম্ব বেড়েছে। দেশে ও বিদেশে সক্রিয় অনৈতিক দালালচক্র- বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক চক্র- এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। অতীতে এ ধরনের অপরাধে মামলা ও শাস্তির হারও তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
এ সময় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা জাল ভিসার বেশ কয়েকটি গুরুতর ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরেন। একজন জানান, তারা ৬০০টির বেশি ভিসা আবেদন পেয়েছেন, যেগুলোর সঙ্গে জাল চাকরির অফার লেটার সংযুক্ত ছিল।
আরেকটি দেশ একই এলাকা থেকে ৩০০টি পর্যটন ভিসার আবেদন পেয়েছে, যার সবগুলোতেই একই ব্যাংকের ভুয়া স্টেটমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছিল। অন্য একটি ঘটনায় বলা হয়, একটি ফেসবুক পেজ বিদেশে যেতে সহায়তার নামে ৭০ জন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর তা বন্ধ করে দেয়।
লুৎফে সিদ্দিকী তাদের আশ্বস্ত করে জানান, এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয়ভাবে তদন্ত ও মামলা প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। গত বছর ইমিগ্রেশন পুলিশ গড়ে প্রতিদিন ৪০ জনের বেশি যাত্রীকে ভুয়া নথি থাকায় বিমানবন্দর থেকেই ফিরিয়ে দিয়েছে।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দেশের প্রতিনিধিরা এ সময় ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধাসম্পন্ন বিমানবন্দরগুলোর অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ জানান। এসব বিমানবন্দর অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো দেশে অবৈধভাবে প্রবেশের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি দেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত বছর তারা ছয় হাজারের বেশি বাংলাদেশির আশ্রয় আবেদন পেয়েছেন, যারা শুরুতে ছাত্র বা কর্মভিসায় ওই দেশে প্রবেশ করেছিলেন।
তারা জানান, বাংলাদেশি নথিপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ বেড়ে যাওয়ায় কিছু দেশে ভিসা প্রক্রিয়াকরণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এমনকি একটি দেশ চলমান তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে বাংলাদেশ থেকে ভিসা আবেদন জমা নেওয়াও স্থগিত রেখেছে।
তবে আলোচনায় বিভিন্ন ইতিবাচক দিকও উঠে আসে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট যাচাই সহজ করতে কিউআর কোড চালু করায় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)-এর প্রশংসা করা হয় এবং এ উদ্যোগ পুরো ব্যাংকিং খাতে সম্প্রসারণের আহ্বান জানানো হয়।
আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে সমন্বয় জোরদারে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় চুক্তির অগ্রগতিও বৈঠকে স্বীকৃত হয়। ঢাকা জানায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রিটার্নি কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমসহ বিভিন্ন কারিগরি সহায়তা এখন আরও কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) জানায়, তাদের অধিকাংশ কার্যক্রম এখন সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত। এর ফলে প্রথমবারের মতো বিএমইটি কার্ডধারীদের বিদেশ গমন ও পুনঃপ্রবেশ কার্যকরভাবে নজরদারির আওতায় এসেছে।
বাংলাদেশের হেগ অ্যাপোস্টিল কনভেনশন-এ যোগদানের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা অ্যাপোস্টিল যেন উৎস ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে সম্পূর্ণভাবে নির্ভরযোগ্য হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
বৈঠক শেষে সব পক্ষ স্বচ্ছভাবে মানবপাচার ও অভিবাসন সংক্রান্ত সমস্যাগুলো মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন। রাষ্ট্রদূতরা বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বর্তমানে যে মাত্রার সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে, তা অভূতপূর্ব।
বৈঠকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


